মহিলা বিশপ-মহিলা পুরোহিত ও সংস্কার আন্দোলনের পর্যবেক্ষণ
প্রিয়াংশু দে
এই বছরের ২৮শে জানুয়ারি Sarah Elisabeth Mullally 'Archbishop of Canterbury' পদে নির্বাচিত হন [1]। Church of England-এর ইতিহাসে এই প্রথম এবং সারা বিশ্বের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কোনো মহিলা পাদ্রী 'প্রাইমেট' অর্থাৎ ধর্মীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। এহেন সিদ্ধান্তকে আমাদের ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা দরকার। এর আগে ২০০৬ সালে Katharine Jefferts Schori মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Episcopal Church-এর প্রিসাইডিং বিশপ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন [2]। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার সমাজ গঠনের পথের ভিন্নতা রয়েছে। ইউরোপ মহাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পুঁজিবাদী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে সামন্ততন্ত্রের সাংস্কৃতিক অবশেষ রয়ে গেছে। আর মার্কিন মুলুকে এই সামন্ততন্ত্রের নাগপাশ বহিরাগতদের মারফৎ কিছুটা অনুপ্রবেশ করলেও ইউরোপের তুলনায় দুর্বলতার সুযোগে ঐতিহাসিকভাবে বহু উদারবাদী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তাই মার্কিন দেশেই প্রথম মহিলা বিশপ নির্বাচিত হতে পেড়েছে কিন্তু ধর্ম সংস্কারের বর্তমান অক্ষ ব্রিটেনেই অবস্থিত। বর্তমান নয়াউদারবাদী দশা প্রগতিশীলতার পথে না থাকলেও, বিকশিত পুঁজিবাদের ব্রিটিশ সংস্করণ এই সংস্কারের মাধ্যমে নিজের ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বের আয়ু কিছুটা বাড়িয়ে নিতে চাইছে।
মহিলা আর্চবিশপের নিয়োগকে Anglican সম্প্রদায়ের প্রগতিশীল অংশের সমর্থকেরা সাদরে গ্রহণ করলেও, রক্ষণশীল অংশ তার তীব্র বিরোধ করে চলেছে [3]। সারা বিশ্বের Anglican Communion-এর রক্ষণশীল সদস্যদের সংগঠন GAFCON ইংল্যান্ডের চার্চের সাথে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের নিজস্ব কাউন্সিল গঠন ও বিরোধী ধর্মপ্রধান নির্বাচনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে [4]! এর আগেও মহিলা ও LGBTQIA+ সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণের প্রশ্নে Anglican সমর্থকদের আড়াআড়িভাবে ভাগ হতে দেখা গেছে [5]। ফলে প্রোটেস্ট্যান্টদের সবার মধ্যেই যে বিশাল প্রগতিশীলতা দেখা যাচ্ছে, এমনটা নয়। ভ্যাটিকানের Ecumenical Office আনুষ্ঠানিকভাবে আর্চবিশপকে অভিনন্দন জানালেও ও কার্ডিনাল Koch তাঁর চিঠিতে সম্প্রীতির কথা বললেও, সেই একই চিঠিতে তিনি Catholic ও Anglican গোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজনের কথাও বলেছেন [6]। ফলে Protestant ও Catholic - দুই পক্ষের রক্ষনশীলরাই ধর্মতত্ত্বকে তুলে এনে সংস্কারের পথে না হেঁটে চিরাচরিত ধ্যানধারণাকে আঁকড়ে বসে থাকতে চাইছে। Catholic Church বরাবরই মহিলাদের পাদ্রী হওয়া ও ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে। পূর্বতন পোপ Francis তাঁর নির্বাচনের আগে ও পরে মহিলা পাদ্রী নিয়োগের বিষয়ে সদর্থক অবস্থান রাখতে ব্যর্থ হলেও [7], তিনি বারংবার চার্চে মহিলাদের অংশগ্রহণ বারানোর কথা বলেছিলেন [8]। তাঁর সময়কালের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল তিনি ভ্যাটিকানের আমলাতন্ত্র অর্থাৎ ‘কিউরিয়া’-তে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছিলেন [9]। তাঁর উত্তরসূরি পোপ চতুর্দশ লিও-র আমলে প্রকাশিত সিনডের রিপোর্টে ধর্মতত্ত্বের মূল্যায়নের মাধ্যমে শাসনতন্ত্রের নয়া রূপদান করে মহিলাদের বৃহত্তর অংশগ্রহণের মত ঘোলাটে কথা বললেও মহিলাদের পাদ্রী হওয়ার বিষয়ে চার্চ আজও নেতিবাচক [10]। সেই রিপোর্টেই আবার বলা হয়েছে যে আমলাতন্ত্রে অংশগ্রহণের সুযোগের পড়েও মহিলাদের প্রতি চিরাচরিত আচরণ আজও অটুট রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া সত্ত্বেও তাঁদের ব্যাপকভাবে কাজে বা সিদ্ধান্তে জড়ানো হয় না বা তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের সমকক্ষ হিসেবে দেখা হয় না [10]। এছাড়া LGBTQIA+ সম্প্রদায়ের প্রতিও ভ্যাটিকানের মতামতে পরিবর্তন হবে না, সেটাও বর্তমান পোপ জানিয়ে দিয়েছেন [11]। তাছাড়া যা সংশোধন হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। পরবর্তীকালে তা সহজেই বাতিল করা যেতে পারে।
Anglican-দের Catholic-দের তুলনায় বেশি প্রগতিশীল হওয়ার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তাদের উৎপত্তির ইতিহাসে। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি পুত্র সন্তান লাভের আশায় একাধিক বিবাহ করেন। পোপ সপ্তম ক্লেমেন্টিন তাঁর পরবর্তী বিবাহগুলিকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তিনি Catholic Church-এর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেকে ইংল্যাণ্ডের চার্চের প্রধান ঘোষনা করলেন। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডে জন্মানো এই প্রটেস্ট্যান্ট চার্চই সে দেশের পুঁজিবাদ বিকাশের সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করে। রাজার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার অস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও Anglican Protestanism আদতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটিয়েছে। ফলে Anglican Communion সে দেশে প্রগতির প্রতীক। অন্যদিকে Catholic Church সামন্ততন্ত্রের সাংস্কৃতিক ধারক।
Sarah Mullaly-র পূর্বসূরীরা বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন সমসাময়িক পরিস্থিতির নিরিখে। যেমন ইংল্যান্ডের চার্চ প্রথম দিকে বিবাহবিচ্ছেদিদের তাঁদের অধীনস্ত চার্চে পুনর্বিবাহের অনুমতি না দিলেও ২০০২ সালের পর থেকে সেই অনুমতি দেওয়া শুরু হয়েছে। পুনর্বিবাহিত দম্পতিদের আশীর্বাদ দানের ক্ষেত্রে Communion তাঁদের পূর্ববর্তী অবস্থান অনেকটাই শিথিল করেছে [12]। কিন্তু চার্চের পাদ্রিরা যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে থাকলে আর্চবিশপরা বরাবরই খুব কঠর অবস্থান না নিয়ে তা ঢাকা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করে এসেছে। তাদের কোনো শাস্তি না দিয়ে অন্য চার্চের পাদ্রি হিসেবে স্থানান্তরিত করা হয়েছে [13]। এর আগের আর্চবিশপ Justin Welby তাঁর আমলে এরকমই এক যৌন কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগের মাঝে ইস্তফা দেন [14]। ফলে সেই কেলেঙ্কারি ঢাকার জন্যও মহিলা আর্চবিশপ নির্বাচন হয়ে থাকতে পারেন। বিগত কয়েক দশকে ইংল্যান্ডের চার্চের সদস্য সংখ্যা গুরুতরভাবে কমেছে [15]। ২০২১-এর একটি সেনসাসে দেখা গিয়েছিল, যুক্তরাজ্যে এক দিকে যেমন খ্রিস্ট ধর্মের জনপ্রিয়তা ১৩.১% হারে কমছে, অন্যদিকে অন্যান্য ধর্মসমূহের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যে নাস্তিকতার জনপ্রিয়তা ১২% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে [16]! আবার ইংল্যান্ডে অন্যান্য খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে (যেমন Pentecostal এবং Evangelical) [17]। ফলে ইংলিশ চার্চের এই প্রগতিশীলতা জনপ্রিয়তা বাড়ানোর বিশেষ কৌশলও হতে পারে। দেখার বিষয়, নতুন আর্চবিশপের আমলে চার্চ বিবাহবিচ্ছেদিদের ও LGBTQIA+ সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে পারে কিনা। রাজা তৃতীয় চার্লস রাজ্যাভিষেকের অনেক আগে ১৯৯৪ সালে বলেছিলেন যে তিনি “Defender of the Faith” না হয়ে “Defender of Faiths” হতে চান [18]। কিন্তু যুক্তরাজ্যে অন্যান্য ধর্মের ব্যাপক অস্তিত্ব থাকলেও সে দেশ আদতে খ্রিস্টিয় ধর্মীয় কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয়। House of Lords-এ আর্চবিশপ সহ শুধুমাত্র অন্যান্য Anglican বিশপদের Lord Spiritual হিসেবে নিযুক্ত করা তারই ইঙ্গিত দেয়।
ধর্ম যেখানেই থাকবে, সেখানে ভাববাদও থাকবে। আর ভাববাদ থাকলে অপবিজ্ঞানও থাকবে। তাই পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে উপরোক্ত বিষয়ে হঠাৎ এতো আলোচনা হচ্ছে কেন? ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে কেন্দ্রিয়ভাবে কোনো প্রগতিশীল মেহনতি জনতার আন্দোলনের অস্তিত্ব নেই। ফলে আমরা এক প্রতিক্রিয়ার যুগে বাস করছি। শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে যেটুকু যা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা আজ সংকুচিত। ফলে নতুনভাবে সংস্কার আন্দোলনের কথা ভাবার সময় চলে এসেছে। কারণ সংস্কার ব্যতীত বিপ্লব সম্ভব নয়। খ্রিস্টধর্মের মত হিন্দুধর্ম এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রিয়ভাবে সংগঠিত নয়। এই ধর্মে মহিলা পুরোহিত নেই। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমাদের রাজ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে মহিলা পুরোহিতরা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে [19]। সে ক্ষেত্রে বরদের সিঁদুরের টিপ পড়ানো হবে কিনা বা কন্যাদান হবে কিনা এরূপ বিভিন্ন বিতর্ক উঠে এসেছে। এই বিতর্কগুলোই প্রগতিশীল চিন্তার পথ প্রশস্ত করতে পারে। কিন্তু মহিলা পুরোহিতের দ্বারা বিবাহ কার্য তাদের বিপুল ফি-এর দরুণ শুধুমাত্র সমাজের সম্ভ্রান্ত অংশে সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। সেটি এখনও গণআন্দোলনের রূপ নিতে পারেনি। আবার মহিলাদের পৌরোহিত্য শুধু বিবাহকেন্দ্রিক হয়ে থাকলেই চলবে না; যদিও ড. নন্দিনী ভৌমিক ও তাঁর দল ২০২১ সালে ৬৬ পল্লির দূর্গাপুজো করেছিলেন [20]। কিন্তু সমাজে ব্যাপকভাবে এই রীতির বিস্তার ঘটেনি। আবার মহিলাদের পৌরোহিত্য শুধু ব্রাহ্মণ মহিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লেও সেটি ঘুরপথে ব্রাহ্মণ্যবাদেরই বিস্তার হবে। লিঙ্গভেদে ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সকলে যাতে পৌরোহিত্যের সুযোগ পায়, এই ধর্ম সংস্কার আন্দোলনকে সেই অভিমুখে নিয়ে যেতে হবে। প্রান্তিকায়িত লিঙ্গের মানুষরাও যাতে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই দিকেও যথেষ্ট লক্ষ্য রাখতে হবে। ফলে আমাদের সংস্কার আন্দোলনের পথও অনেক লম্বা। আজও হিন্দুধর্মে মহিলাদের মূলত ভোগ রান্না ও আলপনা দেওয়ায় সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানের প্রগতি সত্ত্বেও আজও কুমারী পুজোর মধ্যে দিয়ে স্ত্রী লিঙ্গের সন্তান ধারণের রহস্যকে উদযাপন করা হয়। ফলে মহিলারা ঋতুবতী হলেই তাঁদের পুজোর অযোগ্য ধরে নেওয়া হয়। হিন্দুধর্মে ব্যাপক রক্ষণশীলতা রয়েছে। আবার পশ্চিম থেকে আগত আমাদের দেশে Anglican তথা অন্যান্য খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তুলনামূলক কম প্রগতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়। ধর্মে মহিলাদের নেতৃত্বও কম। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্মে মহিলাদের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে খুবই কম। ফলে সকল ধর্মেই সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তথ্যসূত্র
[1] Sarah Mullally enthroned as firsmo]pt female
archbishop of Canterbury, Aljazeera
[2] Woman elected Episcopal Church head, Neela
Banerjee, The Times of India
[3] Anglican groups’ strong objections to Sarah
Mullally’s leadership as first female Archbishop of Canterbury in 1400 years, The
Times of India
[4] Rejecting Canterbury decision, conservative
bishops claim lead of Anglican Communion, Fredrick Nzwili, Religion News
Service
[5] Friction over LGBTQ issues worsens in global
Anglican church, Africa News
[6] Vatican congratulates first female archbishop of
Canterbury, Cindy Wooden, America – The Jesuit Review
[7] Why Pope Francis Won’t Let Women Become Priests,
John Allen, Time
[8] POPE FRANCIS HIGHLIGHTS WOMEN’S ROLE IN CHURCH AND
SOCIETY, Joan Lewis, Joan’s Rome Blog
[9] Progress for Women in the Catholic Church Under
Pope Francis, Women’s Ordination Conference
[10] Vatican releases synod report on women’s role in
Church leadership, Courtney Mares, Catholic Review
[11] Pope Leo XIV: 'No change in Church doctrine on
gays and trans people', Filippo Gozzo, Euro News
[12] Marriage after divorce, The Church of England
[13] The Anglican church’s long history of failing to
act on abuse, The Guardian
[14] Church of England head Justin Welby resigns over
handling of sex abuse scandal, Danica Kirka, AP News
[15] Is The Church of England Inevitably Destined for Extinction?,
Paul Walker, Medium
[16] Religion, England and Wales: Census 2021, Office
for National Statistics,UK
[17] https://en.wikipedia.org/wiki/Religion_in_England
[18] King Charles to be Defender of the Faith but also
a defender of faiths, Harriet Sherwood, The Guardian
[19] Female Wedding Priests Defy Patriarchy in India, Chirag
Gaur, Maps of India
[20] Female priests prepare for historic Durga Puja debut, Debolina Sen, The Times of India
Pic Courtesy:
https://statussinglestories.wordpress.com/2021/02/12/smashing-patriarchy/

Comments
Post a Comment