অগ্নিগর্ভ ফ্রান্স: মে ’৬৮-র পুনরাবৃত্তি?

সংকল্প 

জরাজীর্ণ স্কুলবাড়ি আর এদিকে পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, তাই আন্দোলন। শুনলে অনেকে অবাক হবেন, আমি পশ্চিম বাংলার কথা বলছি না। বলছি সুদূর ফ্রান্সের কথা। “ফ্রান্স হাঁচলে পরে গোটা ইউরোপের সর্দি লাগে”। ১৮৩০-এর বিপ্লবের সময়ে অস্ট্রিয়ার রক্ষণশীল রাষ্ট্রনায়ক মেটারনিখ বলেছিলেন এই কথা। তারপর ’৪৮, ’৭১ হয়ে বিংশ শতাব্দীর ’৬৮, বরাবরই ফ্রান্স এগিয়ে থেকেছে সামাজিক বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের প্রশ্নে। ২০২৬-এর অক্টোবর মাসে এসে আবার ইউরোপ সহ গোটা পৃথিবী জুড়ে শিক্ষার্থী-যুবদের নেতৃত্বে লড়াকু গণআন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে প্রায় একইরকম কতগুলি দাবি নিয়ে। আর আন্তর্জাতিক সংবাদে শিরোনাম ছাড়তে নারাজ ফরাসী দেশ।

সূত্রপাত দক্ষিণপূর্ব প্যারির ক্রেতেই অঞ্চলে অবস্থিত স্যাঁত-এগজ্যুপেরি নামক সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। এরপর অক্টোবরের মধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ। এর সাথে যুক্ত হয় বিভিন্ন ইউনিয়ন ও “হলুদ জ্যাকেটধারী” আন্দোলনকারীরা। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ম্যাক্রোঁ সরকার এই “হলুদ জ্যাকেটধারী” আন্দোলনকারীদের সম্মুখীন হয়েছিল জ্বালানি ও ডিজেলের ওপর করবৃদ্ধির কারণে। পরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যখনই বেড়েছে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন এই মূলত শ্রমজীবী ও নিম্নমধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসা মানুষেরা।

ইরানের ওপর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও তার ফলবসত দীর্ঘ সময় জুড়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে থাকার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ এক ধাক্কায় বেড়ে যায়। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপে ফ্রান্স সরকারকে তাদের বাজেট ঘাটতি কমাতে এবং সরকারি ঋণের বোঝা স্থিতিশীল রাখতে হচ্ছে। তাই আগের মতন শুল্ক রক্ষাকবচ দিয়ে সংকটকে ঠেকান যাচ্ছে না। প্রথাগত উদারপন্থী দলগুলোর দুর্বলতার ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যস্থানটি এখন উগ্র-দক্ষিণপন্থীদের (মেরিন ল্য পেনের ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ বা আরএন) শক্তিশালী করছে এবং সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে। এর মাঝেই এই আন্দোলন আশার আলো দেখাচ্ছে।

চলতি আন্দোলনে আমরা দেখলাম ব্যাপক ধরপাকড় ও বর্বর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন। স্কুলে ঢুকে অল্প বয়সি ছেলেমেয়েদের নির্মমভাবে পেটাচ্ছে ফরাসী পুলিশ। অনেকেই যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর সাথে বিশেষ উল্লেখযোগ্য পুলিশের চরম বর্ণবাদী আচরণ ও কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের বেছে বেছে আক্রমণ করবার পুরন অভ্যেস। ইতিমধ্যে অন্তত দুইজন পড়ুয়া নিহত হয়েছেন। লঁস শহরে একটি বিস্ফোরক স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে গেছে। একাধিকজন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন রাষ্ট্রীয় হামলার কারণে। এরকম আরও বহু নৃশংসতার কথা জানা যায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘাঁটলে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেভাবে গড়ে উঠল

১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষকদের একটি ধর্মঘটের পর স্যাঁত-এগজ্যুপেরি স্কুলের পড়ুয়ারা একটি ব্লকেডের প্রচেষ্টা শুরু করেন। এরপর এই ব্লকেড আন্দোলন ছড়িয়ে যায় আশেপাশের বিভিন্ন স্কুলগুলিতে। শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ইউএসএল ২৯ তারিখে সর্বত্র ব্লকেডের ডাক দেয়। সেদিন ছিল পাব্লিক সেক্টরে ধর্মঘট। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘটরত শ্রমিকদের সাথে মিছিলে পা মেলান। পরের দিন, এক সূত্র অনুযায়ী, ৬২৫ জন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন। ১ অক্টোবর পুলিশের হিসাব অনুযায়ী মোট ৩৪০টি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় ও ১৬৯টি অবরোধ সংগঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও এতে অংশগ্রহণ করেন। এরপর বিরাট বিরাট মিছিল সংগঠিত হতে শুরু হয়। অবরুদ্ধ বা বন্ধ স্কুলের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যায়। বিচার মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে হাইস্কুল অবরোধের ঘটনায় ৭,৯৫০ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৬,৭৭৩ জনই নাবালক।

১৭ অক্টোবর ছিল একটি বিশেষ দিন। বেড়ে চলা জীবনধারণের খরচ সংক্রান্ত কর্মসূচিটির ডাক দিয়েছিল ‘জিলে জোন’ (হলুদ জ্যাকেটধারী আন্দোলনকারীরা)। হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরাও এতে সমর্থন জোগায়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৫,৫০,০০০, আর সংবাদমাধ্যম ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মতে এই সংখ্যা প্রায় ৮,০০,০০০। সেই রাতে ফ্রান্সে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ, আমজনতা ও পুলিশের মধ্যেকার, পথদাঙ্গার চিত্র দেখা যায়। প্যারি, লিওঁ ও মার্সেইতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মার্সেইয়ের টাউন হলে হামলা চালানো হয় এবং লিমোজের টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দ্য গার্জিয়ান-এর তথ্যমতে, প্রায় ২,৫০০ থেকে ২,৭০০জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির “নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল”। তাই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আগামী দিনগুলিতে বেশ কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করে রাষ্ট্র। ২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ ঘোষণা করেন যে শ্রমিক ইউনিয়নবহির্ভূত বিক্ষোভগুলিকে নিষিদ্ধ করা হবে। ইউনিয়নগুলো ২১ তারিখ প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। লেকর্নুর পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে ‘সহিংসতা থেকে প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার’ কথা উল্লেখ ছিল।

প্রথমে ছাত্রছাত্রীদের দাবিগুলি খুবই সামান্য বলে মনে হতে পারে। তাঁরা আরও শিক্ষক চান, অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলে অন্য শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান। যে স্কুলগুলির ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে, দেওয়ালে ছত্রাক জমে, শৌচাগার ভাঙাচোরা এবং বসার চেয়ারও যথেষ্ট নেই, সেই স্কুলগুলির ভবন মেরামতির জন্য অর্থ বরাদ্দ চান। তাঁরা দীর্ঘ সময়ের ক্লাস-রুটিন ও লাগাতার পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি চান। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করা ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি বাছাই করে এমন ব্যবস্থা, পারকুরসুপ, বাতিলের দাবি জানান। আন্দোলন যত ছড়িয়েছে, দাবির তালিকায় ততই যুক্ত হয়েছে পুলিশি হিংসার অবসানের দাবি। ২৬ অক্টোবর সরকার একগুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে পাল্টা জবাব দেয়: ২০৩০ সালের মধ্যে স্কুল ভবন নির্মাণ ও মেরামতির জন্য অঞ্চলগুলিকে কম সুদে ৪০০ কোটি ইউরো ঋণ, সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক স্কুলে ১৫ বছর বয়সি ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে সর্বাধিক ২৮জনের সীমা (পরের বছর যা সমস্ত স্কুলে চালু হবে), বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ১৫,০০০ আসন এবং ২০২৭ সালে পারকুরসুপের পরিবর্তন ও ২০২৮ সালে তার প্রতিস্থাপন। এর আগে ঘোষিত ৩,০০০ জন অস্থায়ী বিকল্প শিক্ষকের নিয়োগও এই একই প্রস্তাবের অংশ। ছাত্রছাত্রীদের জবাব আসতে দেরি হয়নি। ইউনিয়ন এত্যুদিয়ঁত ১৫,০০০ আসনকে অন্তত ২,৫০,০০০ আসনের প্রয়োজনের তুলনায় ‘উচ্ছিষ্ট’ বলে অভিহিত করে এবং জানায়, তারা বাছাই প্রক্রিয়ার সংস্কার নয়, তার সম্পূর্ণ বিলোপ চায়। খুব গুরুত্বপূর্ণ এই দাবি। একই দাবি আমরা ত্রৎস্কিপন্থীরা ভারতেও করে আসছি। বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিশেষ পরীক্ষা কিংবা বিশেষ কেন্দ্রীয় পরীক্ষা যথা এনটিএ পরিচালিত সিইউইটি, জেইই, নিট, ইত্যাদি, যা আদপে আসন সংখ্যার অপর্যাপ্ততা ঢাকবার কৌশলমাত্র, সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। উল্টে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ও প্রত্যেক এলাকায় উন্নতমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে।

আসলে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ তার জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশ। ২১ অক্টোবর দশ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ৫ শতাংশ ছুঁয়েছিল, ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ; এক দিনের জন্য তা মার্কিন সুদের হারকেও ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপ সরকারকে বাজেট ঘাটতি কমাতে বাধ্য করছে। তাই দিনের শেষে সমস্ত সমস্যার উৎস সেই মরণমুখী পুঁজিবাদের সংকট।

ফরাসী সাম্রাজ্যের বর্ণবাদী চরিত্র ও বর্তমান আন্দোলন

এক সূত্র অনুযায়ী আরব ও কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের আধিক্য থাকা শহরতলির স্কুলগুলো থেকেই আন্দোলনের শুরু হয় এবং এ সময় “লা জ্যনেস এমের্দ ল্য আরএন” (‘তরুণ প্রজন্ম আরএন-কে ধিক্কার জানায়’) স্লোগানটি পুনরায় সামনে উঠে আসে। উল্লেখ্য যে বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার কিশোর-কিশোরীরা, যাঁরা আগে থেকেই পুলিশের বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি, দমনপীড়নের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন।

আগস্টের শেষের দিকে মায়োতের আকুয়াতে একটি স্কুলে একটি ব্লকেড সংগঠিত হয়েছিল। ক্ষোভের উৎস হল, যে স্কুলে ধারণক্ষমতা ৯০০ জনের, সেখানে বর্তমানে ২,৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রিপোর্ট করেছে যে ফ্রান্সের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল মায়োতে, এর জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই এলাকার স্কুলগুলিতে ভিড়ের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে ক্লাস করতে বাধ্য হন ছাত্রছাত্রীরা। মূল ভূখণ্ডে, একটি ইউনিয়ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সেন-সঁ-দনির দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষকের শূন্যপদ রয়েছে (রয়টার্স)।

‘অধিকাররক্ষক’-এর ২০২৪–২৫ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কৃষ্ণাঙ্গ, আরব বা মাগরেবি হিসাবে বিবেচিত যুবকদের বাকি জনসংখ্যার তুলনায় চারগুণ বেশি তল্লাশি করা হয় এবং আক্রমণাত্মক এমন সব তল্লাশির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বারোগুণ বেশি। ২০২৩ সালে নাহেল মেরজুকের হত্যার পর, জাতিসংঘের বর্ণবাদবিরোধী কমিটি অত্যধিক শক্তি প্রয়োগের সাথে মিলিত জাতিগত প্রোফাইলিংয়ের একটি অব্যাহত অনুশীলনের সমালোচনা করেছিল। ফরাসী কর্তৃপক্ষ এর উত্তরে বলে যে পুলিশের বর্ণবাদের যে কোনো অভিযোগ ভিত্তিহীন।

২৩ অক্টোবর ম্যাক্রোঁ এলিজে প্রাসাদে প্রায় ২০জন ছাত্র প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে ত্রাপ/লা ভেরিয়েরে একটি বর্ণবাদী হামলায় ২৬ বছর বয়সি ফরাসী-কঙ্গোলিজ মার্শাল আর্টিস্ট পেঙ্গো বস্সিও ওয়াঙ্গি নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। অন্যদিকে ‘ফেদেরাসিওঁ লিসিয়েন দে কার্তিয়ে’ যা শ্রমজীবী ​​এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে তাকে লেকর্নুর সাথে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একই সপ্তাহান্তে অরলেঁতে ‘আরএন’-বিরোধী একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় পঞ্চাশটি সংগঠনের আহ্বানে আয়োজিত এই মিছিলে প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী ১১,০০০ এবং আয়োজকদের হিসাব অনুযায়ী ২৬,০০০ মানুষ অংশ নেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে

১৭ তারিখের পর থেকেই মে ’৬৮-র ‘ব্যারিকেডের রাতের’ ছবিগুলি ফিরে ফিরে আসছে ফ্রান্স সহ সমগ্র বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রেমী সমাজের স্মৃতিতে। বর্তমান আন্দোলনটি স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন-সংক্রান্ত প্রতিবাদ, গ্রিসে শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবাদ এবং মিলান, ব্রাসেলস ও তিরানায় ঘটা সংঘর্ষগুলোর সাথে সাথেই গড়ে উঠেছে। ১৯৬৮ সালে শিক্ষার্থীরা বিদ্রোহ করে কর্তৃপক্ষকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন, আর তাঁদের দেখাদেখি শ্রমিকরাও এগিয়ে এসেছিলেন। তরুণ শ্রমিকরা যখন কারখানাগুলো দখলে নিতে শুরু করলেন, তখন ট্রেড ইউনিয়নগুলো এবং স্তালিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলো ধর্মঘটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ও সেটিকে একটি সমঝোতার দিকে পরিচালিত করে। আর শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহের পরিণতিতে দ্য গল বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এখন গোটা দুনিয়া জুড়েই সাধারণভাবে মধ্যপন্থী লিবারেল সরকারগুলির প্রতি আর আস্থা রাখছে না বিপুল মধ্যবিত্ত ও মেহনতি জনগণ। তাই অতি-দক্ষিণপন্থার বিপদ আরও বাস্তব হয়ে উঠছে। একই সাথে, প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই রাষ্ট্রীয় হিংস্রতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৪ অক্টোবর ইতালি সরকার ৩৭১ জনকে আটক করেছে, যাদের মধ্যে ১১০ জনই নাবালক। সর্বত্রই রাষ্ট্রগুলো যুব সমাজের দাবির জবাবে পুলিশি ও আধা-সামরিক শক্তি ব্যবহার করছে।

২১ অক্টোবর এথেন্সে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০,০০০ ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক “গ্রিস থেকে ফ্রান্স, আমরা চাই সরকারি, অবৈতনিক শিক্ষা”—এই স্লোগান তুলে মিছিল করেন। শিক্ষক সংগঠনগুলি জানিয়েছে, গ্রিসে মাধ্যমিক স্তরে ১৫,০০০ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বেলজিয়ামে ফরাসীভাষী স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা প্রধানমন্ত্রী দে ভেভারের ১০০০ কোটি ইউরোর ছাঁটাই এবং ভর্তি-ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ধর্মঘটে যোগ দেন। ভিয়েনায় ২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমায়িত বাজেটের বিরুদ্ধে কয়েক দশ হাজার মানুষ মিছিল করেন। জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে স্কুল ধর্মঘট গত ডিসেম্বর থেকে চলছে। ইতালিতে ’১৭ অক্টোবরের আন্দোলন’ মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ট্রাকচালক ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে, আর মিলানে সেনা মোতায়েন করা হয়। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও ভর্তি-ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট করেন। এমনকি নরওয়েতেও, যেখানে এই ধরনের আন্দোলন এখনও দেখা যায়নি, ২৯ অক্টোবর অসলোতে সংহতি মিছিল হয়। সেখানকার এক ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব সতর্ক করেছেন, নরওয়ের ছাত্রছাত্রীরাও তাঁদের সহ্যের সীমায় পৌঁছে যাচ্ছেন।

ইউরোপের বাইরে একই সংকট অন্য রূপে দেখা দিচ্ছে। চিলিতে অতি-দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি কাস্ত ছাত্রছাত্রীদের মিছিলের জবাবে মার্চ মাস থেকে ছাঁটাই ও পুলিশি দমন চালিয়ে আসছেন। ইন্দোনেশিয়ায় ২০ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি প্রাবোওর শাসনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করেন; তাঁদের মোকাবিলায় ৯,৫০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একই সময়ে ভারতে আমরা এসআইআর-বিরোধী দেশজোড়া আন্দোলন দেখছি।

কে দেবে নেতৃত্ব ও আগামীর দিশা

এই আন্দোলনের শক্তি হলো এর প্রাণশক্তি; আর দুর্বলতা সুসংগঠিত কাঠামোর অভাব। ইল-দ্য-ফ্রঁস-এর শিক্ষার্থীরা ৩২টি ক্যাম্পাস থেকে ৯৮ জন প্রতিনিধি নিয়ে একটি আঞ্চলিক সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলেছেন। এমন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোই এই ধরনের আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন। তবে বিপ্লবী বামপন্থীদের মধ্যে বিদ্যমান গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের তাদের সবার থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অনেকের মতে বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো কেবল ক্যাম্পাসে সদস্য সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে এবং পেশাদার আন্দোলনকারীদের নেটওয়ার্কের অনুসারী হিসেবে কাজ করে, তারা যুব সমাজের কোনো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে পারে না। আবার ওপর থেকে মধ্যবিত্ত আমলাতন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো আন্দোলন, যেমন কর্বিনের ‘ইয়োর পার্টি’র অবস্থাও এর চেয়ে ভালো কিছু নয়। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকৃত সংগঠন ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা না থাকলে যেকোনো আন্দোলনই অসংলগ্নতা ও খণ্ড-বিখণ্ডতার দিকে ধাবিত হয়।

আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীরা কীভাবে শ্রমিক শ্রেণির কাছে পৌঁছাবে? অনেক বামপন্থীদের মতে ইউনিয়ন আমলাতন্ত্র ৫ নভেম্বর তারিখটি সাধারণ ধর্মঘটের জন্য নির্ধারণ করেছে মূলত আন্দোলনকে বিলম্বিত করে তরুণদের ক্লান্ত করে তুলে শান্তি ফেরানোর উদ্দেশ্যে। ৩ তারিখে সকলের স্কুলে ফেরার কথা। তবে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, শিক্ষার্থীরা একা জয়ী হতে পারবেন না। চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণিরই রয়েছে। একটি বিপ্লবী যুব আন্দোলন কখনোই শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনের বিকল্প হতে পারে না, বরং এর কাজ হলো সেই শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনের রাজনৈতিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণ করা। আর এর জন্য তরুণদের কেবল ভবিষ্যতের ‘পদাতিক বাহিনী’ হিসেবে নয়, বরং সমাজতন্ত্রের সক্রিয় কারিগর বা প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করতে হবে।

একসময়ে ফ্রান্স ও ইতালির গণভিত্তিসম্পন্ন কমিউনিস্ট পার্টিগুলি, তাদের সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। সেই পার্টিগুলি তাদের সুবিধাবাদী দেউলিয়া রাজনীতির কারণে আজ ভেঙে পড়েছে। ছাত্রছাত্রীদের ও পুলিশের মাঝখানে নিজেদের সাংসদদের দাঁড় করিয়ে ভাইরাল হয়েছে যে একমাত্র সংসদীয় শক্তি, তা হল একটি বাম-সংস্কারবাদী দল। ১৯৬৮ সালে চতুর্থ আন্তর্জাতিকতাবাদী নেতা আর্নেস্ট ম্যান্ডেল সতর্ক করেছিলেন, তরুণ শ্রমিকদের সেরা অংশকে যদি বিপ্লবী বামপক্ষে জয় করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকবে; আর যদি সেই প্রজন্মের বড় অংশ চরম দক্ষিণপন্থার দিকে ভেসে যায়, তাহলে পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়াবে তিরিশের দশকের গোড়ার মতো।

আদপে, সমাজকে অচল করে দিয়ে পুঁজিপতিদের নতজানু করবার ক্ষমতা রয়েছে তাঁদের হাতে, যাঁরা কলকারখানা, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুদাম এবং রেলপথগুলি চালান। ৩০ অক্টোবর তার একটি ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল। ২১টি দেশের ১১৩টি বন্দরে শ্রমিকরা যুদ্ধ ও বন্দরের সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করেন। ফ্রান্স, গ্রিস, বাস্ক অঞ্চল, তুরস্ক, মরক্কো ও ইতালির শ্রমিক সংগঠনগুলি প্রথম এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল; ২৫টিরও বেশি সংগঠন তাতে সমর্থন জানায়। ইতালিতে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন ইউএসবি এই কর্মসূচিকে সাধারণ ধর্মঘটে প্রসারিত করে। এরপর আসছে ৫ নভেম্বর ফ্রান্সে শ্রমিক সংগঠনগুলির ডাকা ধর্মঘট, আর ১১ নভেম্বর স্পেনে আবাসন ও মজুরির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার সাধারণ ধর্মঘট। গত ১৪ বছরে প্রথমবার সিসিওও ও ইউজিটি যৌথভাবে এই স্পেনীয় ধর্মঘটে সমর্থন জানাচ্ছে।

প্রতিটি দেশেই বাজেট সংকোচন, যুদ্ধের পেছনে ব্যয় এবং ঋণের বোঝা সামাল দিতে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি তরুণ প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে; আর তরুণরাও এর বিপরীতে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, যেমন শিক্ষক ঘাটতি, জরাজীর্ণ ভবন কিংবা বেসরকারি স্কুলগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া, এসবই একটি গভীরতর সম্পর্কের লক্ষণ। পুঁজিবাদী সমাজে তরুণদের অবস্থান এমন যে, তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় তাঁরা যেন পুঁজির নিষ্ক্রিয় সেবক, অনুগত শিক্ষার্থী, পরিশ্রমী কর্মী এবং বাধ্য উপভোক্তা হিসেবে থাকেন। শিশুরা ভোট দিতে পারে না, তারা তাদের বাবা-মায়ের আয়ের ওপর নির্ভরশীল; আর যখন তারা নিজেদের উপার্জনের পথ খোঁজে, তখন তাদের অস্থায়ী ক্ষেত্রে নামমাত্র মজুরিতে কাজ করতে হয়।

মার্কস কমিউনিস্ট ইস্তাহার শুরু করেছিলেন এক ভূতের কথা দিয়ে, আর সেই ভূতকে তাড়াতে পুরনো ইউরোপের সমস্ত শক্তি একজোট হয়েছিল। সেই শক্তিগুলি আবারও একজোট হয়েছে, একই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও ব্যয়সংকোচন নীতির সাহায্যে। কিন্তু ভূত এখনও শক্তিতে পরিণত হয়নি। তার একটি দেহ দরকার; আর এখানে সেই দেহ বলতে বোঝায় প্রতিটি দেশে একটি অগ্রণী শ্রমিক পার্টি, যা একই বিপ্লবী কর্মসূচি ও সাধারণ শৃঙ্খলায় আবদ্ধ। এটাই ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’-এর অর্থ।

‘সংবর্ত’ কবিতার শেষে সুধীন দত্ত লিখেছিলেন: 

“অন্তর্হিত আজ অন্তর্যামী:

রুষের রহসে লুপ্ত লেনিনের মামি, 

হাতুড়িনিষ্পিষ্ট ট্রটস্কি, হিটলারের সুহৃদ স্টালিন, 

মৃত স্পেন, ম্রিয়মাণ চীন, 

কবন্ধ ফরাসীদেশ। সে এখনও বেঁচে আছে কি না, 

তা সুদ্ধ জানি না।।” (সেপ্টেম্বর ১৯৪০)

হয়তো ফরাসী দেশ এখনও বেঁচে আছে। তার লড়াইয়ে, তার তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনে, মেহনতি মানুষের আন্তর্জাতিকতাবাদে। তবু শেষ যুদ্ধে কে বিজয়ী হবে তা সময় বলবে।

সংকল্প (নয়া দিশা পত্রিকা) ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। 

মতামত ব্যক্তিগত

Picture Courtesy: Inspired from photos of Reuters/Jack Taylor

Comments

Popular posts from this blog

ইস্ট–ওয়েস্ট করিডোর প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলিপুরদুয়ারের কৃষক-ব্যবসায়ীদের লড়াই চলছে

Polemics on 'Fractured Freedom': C Sekhar responds to Kobad Ghandy's views

কেরালার রাজনীতি এবং অবিপ্লবের চোরাস্রোত