বিজ্ঞানী শম্ভুনাথ দে
সুমিত ঘোষ
প্রথম আলো
শম্ভুনাথ দে ১৯১৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী কলকাতা থেকে ৩০ কিমি দূরত্বে হুগলী জেলার
একদা ফরাসী উপনিবেশ চন্দননগরের নিকট গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ‘গরবাটি’ গ্রামের বুড়ো
শিব তলা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা চট্টেশ্বরী দেবী। পিতা দাশরথী দে পেশায় ছিলেন
একজন ব্যবসায়ী। তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দাশরথীবাবুর
পিতা কম বয়সেই মারা যান। ফলে, পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাঁকেই রোজগারের দায়িত্ব গ্রহণ
করতে হয়। প্রথমে একটি দোকানে সহায়কের কাজ করতে শুরু করেন তিনি; পরবর্তীকালে ব্যবসা।
প্রবল ধার্মিক বৈষ্ণব হওয়ায় ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসেব নিকেশে তাঁর অনীহার কারণে সেই
ব্যবসা বিশেষ দাঁড়াল না। বোঝাই যাচ্ছে, একদা বৈভব থাকলেও, যতক্ষণে শম্ভুনাথ’বাবু পৃথিবীর
আলো দেখলেন, ততক্ষণে তাঁদের পরিবার অভাব অনটনের মধ্যে দিয়েই চলতে শুরু করেছে। তাঁদের
পরিবারে শম্ভুনাথ’বাবুর কাকা আশুতোষ দে একমাত্র স্নাতক স্তর অতিক্রম করেছিলেন। তিনিই
বালক শম্ভুনাথের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে শম্ভুনাথ গরবাটি উচ্চ বিদ্যালয়
থেকে ডিস্টিংশান পেয়ে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষা পাশ করেন। ডিস্ট্রিক্ট স্কলারশিপের অধিকারী
হয়ে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য হুগলী মহসীন কলেজে ভর্তি হন যা তখনকার দিনে ছিল কলিকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ইন্টার-সাইন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডিপিআই স্কলারশিপের অধিকারী
হয়ে শম্ভুনাথ ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। স্কলারশিপের টাকা পড়াশোনার খরচ বহনের
ক্ষেত্রে যথেষ্ট না হওয়ায় কেষ্টধন শেঠ তাঁর নিজের অফিসে শম্ভুনাথের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা
করে দেন। পরবর্তীকালে শম্ভুনাথ কলেজ স্কলারশিপ পেয়ে হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে
যান। তাঁর মেধা ব্যাক্টেরিয়োলজির প্রফেসর এমএন দে-র নজর এড়িয়ে যায় না। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ
কন্যা তরুবালা দেবীর সাথে শম্ভুনাথের বিবাহ সম্পন্ন করেন। দুই পরিবারের আর্থিক অবস্থার
বিস্তর ফাড়াক সেই সময়ে এই বিবাহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও এমএন দে-র জহুরীর চোখ রত্ন
চিনতে ভুল করেনি। ১৯৩৯ সালে শম্ভুনাথ এমবি পরীক্ষা পাশ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি ট্রপিক্যাল
মেডিসিনে ডিপ্লোমার অধিকারী হন। এরপর ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ডেমন্সট্রেটার হিসেবে
নিযুক্ত হয়ে প্রফেসর বিপি ত্রিবেদীর তত্ত্বাবধানে নিজের গবেষণা শুরু করেন। একান্নবর্তী
পরিবারের খরচ সামলানোর জন্য এই সময়ে তিনি প্রাইভেট প্র্যাক্টিসও শুরু করেন। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হলে ১৯৪৭ সালে তাঁর শ্বশুর তাঁকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্বিড অ্যানাটমি
বিভাগের প্রফেসর জিআর ক্যামেরুনের কাছে পাঠিয়ে দেন পিএইচডি-র গবেষণা শুরু করার জন্য।
বিজ্ঞানীর যাত্রা শুরু…
প্রফেসর ক্যামেরুনের তত্ত্বাবধানে তিনি মস্তিষ্কে জল জমা (হাইড্রোসেফ্যালাস)
রোগ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু, ইঁদুরের দেহে সেই রোগ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করে তাদের
উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো সহজ ছিল না। শম্ভুনাথ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে ইঁদুরের
দেহে সেই রোগ সৃষ্টি করতে বারংবার অসফল হলেন। সেই রোগ সৃষ্টি হওয়ার বদলে ইঁদুরগুলির
শ্বাসজনিত সমস্যা এবং মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরোতে শুরু করল। কাজ শুরু করার প্রথম তিন
মাসের মধ্যেই এই বিফলতা সহ্য করতে না পেরে শম্ভুনাথ মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। গবেষণা
ছেড়ে দিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সময়ে তাঁর প্রফেসর এবং সারাজীবনের বৈজ্ঞানিক
কাজকর্মের পথ নির্দেশক প্রফেসর ক্যামেরুন তাঁকে নতুন করে চেষ্টা করার অনুপ্রেরণা জোগালেন।
বিফলতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার উপদেশ দিলেন। গবেষণার মধ্যে দিয়ে দেখা গেল মস্তিষ্কে জল
জমার সাথে শ্বাসজনিত রোগের (রেস্পিরেটরি ইডেমা)-র সম্পর্ক রয়েছে। ফলে, বিজ্ঞান গবেষণায়
কোনও পরীক্ষার নঞর্থক ফলাফলও নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দিতে পারে। প্রফেসর ক্যামেরুনের
এই শিক্ষা শম্ভুনাথের বিজ্ঞান সাধনায় সারাজীবন পাথেয় হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রী
লাভ করে শম্ভুনাথ দেশে ফিরলেন। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে চাকরী শুরু করলেন। ঠিক
করলেন কলেরার সংক্রমণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করবেন। সঙ্গী হলেন তাঁর ক্যালক্যাটা মেডিক্যাল
কলেজের একদা বন্ধু জলধি কুমার সরকার। জলধি সরকার পরবর্তীকালে স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর
ভাইরোলজি ও ব্যাক্টেরিয়োলজির প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন।
কলেরা সম্পর্কে দু-চার কথা…
কলেরা বা ব্লু ডেথ একটি দূষিত জল জনিত ছোঁয়াচে রোগ। ভিব্রিয়ো কলেরি ব্যাক্টেরিয়া এই রোগ ঘটায়। দূষিত জল বা খাবার, যাতে এই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, তা এই রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। রোগাক্রান্তদের অতিমাত্রায় বমি, পায়ের পেষিতে ব্যাথা, ডাইরিয়া (পাতলা পায়খানার মাধ্যমে শরীরের জলের পরিমাণ হ্রাস) এবং ডিহাইড্রেশান লক্ষ্য করা যায়। রোগীর দেহে সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়ে পায়খানার মধ্যে দিয়ে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করে। এইভাবেই কলেরা মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। কলেরা ব্যাক্টেরিয়ার বিভিন্ন ধরণ বা স্ট্রেইন রয়েছে। এর মধ্যে ও১ এবং ও১৩৯ সেরোগ্রুপ মহামারী ঘটাতে সিদ্ধহস্ত। অন্যান্য স্ট্রেইনগুলি কেবল ডাইরিয়া ঘটায়।
ভারতীয় উপমহাদেশের সুশ্রুত এবং গ্রীক চিন্তাবিদ’দ্বয় হিপোক্রাটিস ও অ্যারিটেইয়াস আলাদা আলাদাভাবে কলেরা রোগ প্রথম চিহ্নিত করেছিলেন। ভারতীয় কুসংস্কারের ইতিহাসে ওলাবিবি-র কলেরা রোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হয়ে ওঠার কাহিনী আজও উজ্জ্বল। পর্তুগীজ ইতিহাসবিদ গ্যাস্পার কোরেয়া প্রথম কলেরা রোগের উল্লেখ করেন ১৫৪৩ সালে গঙ্গার মোহনা অঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ)। এই মারন রোগকে স্থানীয় লোকেরা বলত ‘মরিক্সি’। প্রথম কলেরা মহামারী দেখা দেয় যশোরে ১৮১৭ সালে। সেখান থেকে তা মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং ট্রেড রুট ধরে ইউরোপে পৌঁছায়। ১৮২১-র মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনীর মাধ্যমে তা মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ রাশিয়াতেও পৌঁছে যায়। ১৮২৯ সালে ইউরোপ জুড়ে দ্বিতীয় মহামারী দেখা দেয়। ১৮৩২ সালে লিভারপুল অঞ্চলে ‘কলেরা দাঙ্গা’ দেখা যায়। সেখানকার মানুষের মধ্যে এই ভুল ধারণা তৈরি হয় যে ডাক্তাররা মানবদেহ নিয়ে গবেষণার জন্য জীবন্ত রোগীদের দেহ নির্মমভাবে কেটে ছিঁড়ে তাদের হত্যা করে! কলেরায় মৃত্যুকে তারা ডাক্তারদের চক্রান্ত ভেবে হাসপাতালগুলিতে মারামারি শুরু করে। ১৮৫২-৫৯ তৃতীয় কলেরা মহামারী শুরু হয়। এইবার তা দুই আমেরিকা মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ডাক্তার জন স্নো কলেরা আক্রান্ত লন্ডনের সোহো অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে চিহ্নিত করেন যে দূষিত জলই রোগের কারণ। ১৮৬৩-৭৫ এবং ১৮৮১-৯৬ চতুর্থ এবং পঞ্চম মহামারী দেখা দেয়। ১৮৫৪ সালে ইটালিয়ান অণুজীববিজ্ঞানী (মাইক্রোবায়োলজিস্ট) ফিলিপ্পো পাসিনি প্রথম কলেরা ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু তা জনশ্রুতি না হওয়ায় রবার্ট কচকেই কলেরা জীবাণুর আবিষ্কারক ধরা হয়। আবিষ্কারের ইতিহাসের এটা একটা নির্মম চিত্র। ১৮৮৩ সালে জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী এবং আধুনিক ব্যাক্টেরিয়া বিদ্যার জনক রবার্ট কচ ভারত এবং মিশরের কলেরা রোগীদের পরীক্ষা করে তাদের পাকস্থলীতে কলেরা সৃষ্টিকারী জীবাণু খুঁজে পান। ১৮৯৯-১৯২৩ ষষ্ঠ কলেরা মহামারী দেখা দেয়। এই প্রতিটা মহামারীর প্রাথমিক উৎস ছিল ভারত কিন্তু ১৯৬১ সালের সপ্তম মহামারী শুরু হয় ইন্দোনেশিয়াতে। ১৯৯০-এর দশকে কলেরা পৌঁছায় আফ্রিকায়। ২০১১ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পের পর কলেরা মহামারীতে ৫০০,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে সোমালিয়াতে কলেরা ছড়ায়। একই সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ এবং সৌদি আক্রমণের বাতাবরণে কলেরা মহামারী দেখা দেয়। ৫০০,০০০-এর কাছাকাছি মানুষ রোগাক্রান্ত হন এবং প্রায় ২০০০ মানুষ মারা যান।
কেন শম্ভুনাথ কলেরা নিয়ে গবেষণার পথে হাঁটলেন?
ইংল্যান্ডে
গবেষণা চলাকালীনই শম্ভুনাথ ব্যাক্টেরিয়োলজির প্রতি আকৃষ্ট হন। সেখানে তাঁর এক
সহকর্মীর আমাশা সৃষ্টিকারী টক্সিন (বিষ) নিয়ে কাজকর্ম তিনি গভীর মনোযোগে
পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে কলকাতায় ফিরে এসে এনআরএসে প্যাথোলজি বিভাগে যখন
তিনি নিযুক্ত হন, তখন দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তান
থেকে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে আসতে শুরু করেছে; রিফিউজি
কলোনিগুলিতে কলেরা দেখা দিতে শুরু করেছে এবং কলেরা রোগাক্রান্তরা এনআরএস-এ এসেই
ভর্তি হচ্ছে। ফলে, শম্ভুনাথ কলেরা রোগ নিরাময় পদ্ধতি খুঁজে বের করাই তাঁর জীবনের
মূল লক্ষ্য হিসেবে স্থির করলেন। কলেরা রোগীদের বিকল হতে থাকা রেচন তন্ত্র
(এক্সক্রিটারি সিস্টেম) সম্পর্কে তাঁর গবেষণা শুরু হল।
রবার্ট কচের ভ্রান্তি
রবার্ট
কচ মনে করতেন যে কলেরা জীবাণু রোগীর সংবহন তন্ত্র (সার্কুলেটারি সিস্টেম)-কে
প্রভাবিত করে। বিজ্ঞানী মহলে তাঁর দাপটের কারণে এই রোগ সম্পর্কে অন্যান্য মডেলগুলি
খারিজ করে দেওয়া হত। ফলে, বিজ্ঞানীরা গবেষণার জন্য প্রাণীদেহের রক্তে কলেরা
জীবাণুর প্রবেশ ঘটিয়ে কিছুতেই কৃত্রিমভাবে কলেরা রোগের সৃষ্টি করে পরীক্ষা
নিরীক্ষা শুরু করতে সফল হতেন না। যেখানে ডিপথিরিয়া জীবাণু ব্যাসিলাস আবিষ্কারের
চার বছর, টিটেনাস জীবাণু আবিষ্কারের ছয় বছরের মাথায় এবং বোটুলিজম জীবাণু
আবিষ্কারের একই বছরে রোগ সৃষ্টিকারী টক্সিন চিহ্নিত হয়েছিল, সেখানে কচের এই
ভ্রান্তির কারণে ১৮৫৪ সালে কলেরা জীবাণু আবিষ্কার হলেও রোগ সৃষ্টিকারী টক্সিন
চিহ্নিত হল ১০৫ বছর পর!
শম্ভুনাথের প্রাথমিক কলেরা বিষয়ক গবেষণা
শম্ভুনাথ
শুরু থেকেই কচের মতবাদের বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে কলেরা জীবাণু পাকস্থলীর
মধ্যে সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং আত্মহনন (অটোলাইসিস)-এর মাধ্যমে তার কোষের বহীর
দেওয়ালের প্রোটিনগুলিকে এন্ডোটক্সিন হিসেবে নিঃসৃত করে। এই টক্সিন পাকস্থলীর
দেওয়াল ভেদ করে বিভিন্ন তন্ত্রের উপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। শুরুর দিকে
শম্ভুনাথ ভেবেছিলেন যে এই টক্সিন নিঃসরণ সংবহন তন্ত্রকেই মূলত প্রভাবিত করে।
১৯৫০
সালে শম্ভুনাথ এবং তাঁর সহকর্মীরা অবচেতন খরগোশের পাকস্থলীর একাংশের দুটি দিক
আবদ্ধ করে তার মধ্যে কলেরা জীবাণু ছেড়ে দিয়ে দেখেন যে ডাইরিয়ার সৃষ্টি না হলেও ৩-৪
দিনের মাথায় প্রাণীটি মারা যায়। তখন তার দুদিক আবদ্ধ পাকস্থলীর সেই অংশ কেটে তাঁরা
দেখেন যে তার মধ্যে সলিড বর্জ্যের বদলে ভাতের ফ্যানের মত তরল পদার্থ ভর্তি রয়েছে।
ইউরেকা!!! শম্ভুনাথ এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রথম কৃত্রিম কলেরা সৃষ্টির পদ্ধতি
আবিষ্কার করলেন। একই সাথে তাঁরা এটাও দেখালেন যে কলেরা জীবাণু থেকে নিঃসৃত টক্সিন
(টক্সিনের অস্তিত্ব এখনও ধারণা মাত্র) পাকস্থলীর দেওয়ালকে প্রভাবিত করে তা থেকে
তরল নিঃসরণের উৎসেচক হিসেবে কাজ করে; এইভাবেই কলেরা সম্পর্কিত ডাইরিয়া এবং
ডিহাইড্রেশানের সূচনা হয়। ওই খরগোশের পাকস্থলীর নির্দিষ্ট অংশের দুদিক আবদ্ধ করে
দেওয়ায় ওই তরল বর্জ্য মলদ্বার দিয়ে না বেরোতে পারায় ডাইরিয়ার লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি।
শম্ভুনাথ আবিষ্কৃত গবেষণার জন্য প্রাণীদেহে কৃত্রিমভাবে কলেরা রোগ সৃষ্টির এই
পদ্ধতিকে বলা হয় ‘র্যাবিট ইলিয়াল লুপ মডেল’। এই মডেল ব্যবহার করে পরবর্তীকালে অধ্যাপক জলধি সরকার ই. কোলাই জনিত ডাইরিয়ার সংক্রমণ পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতে সফল হন। কচের
ভ্রান্ত ধারণার অনুসারী সংবহন তন্ত্রের সংক্রমণের বদলে শম্ভুনাথের পরীক্ষা
ডাইরিয়াকেই কলেরার মারন ক্ষমতার প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। তরল পায়খানার সাথে
শরীরের জল হ্রাসের ফলে ডিহাইড্রেশান দেখা দেয়। ফলে, বলা যায়, শম্ভুনাথের আবিষ্কারই
ডিহাইড্রেশান থামাতে ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশান সলিউশান) তৈরির অনুপ্রেরণা জোগায়।
বাড়িতে খুব সহজেই তৈরি করা সম্ভব বিভিন্ন লবণের দ্রবণ এই ওআরএস-এর ব্যবহার ভারত,
বাংলাদেশ এবং আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ রোগাক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে; স্বস্তি
দিয়েছে।
১৯৫৫
সালে শম্ভুনাথ ইংল্যান্ডে গিয়ে তাঁর কলেরা সম্পর্কিত গবেষণা প্যাথোলজিক্যাল
সোসাইটি অফ গ্রেট ব্রিটেন-এর সদস্যদের সামনে তুলে ধরে প্রশংসিত হন। দেশে ফিরে তিনি
ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজের ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের
জীবাণু বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। কর্তৃপক্ষের দায়ভার সামলে গবেষণার কাজে
সময় দেওয়ার জন্য তিনি প্রাইভেট প্র্যাক্টিস ছেড়ে দেন।
বোস ইন্সটিটিউটে কলেরা টক্সিন আবিষ্কার
শম্ভুনাথ
কলেরা নিরামক টীকা তৈরি করতে চাইছিলেন। এর জন্য কলেরা সৃষ্টিকারী টক্সিনের
অস্তিত্বের প্রমাণ এবং তা রোগীর শরীর থেকে পৃথকীকরণ পরবর্তীতে তার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ
ছিল আবশ্যক। মেডিক্যাল কলেজে এই গবেষণা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির সুবন্দোবস্ত না থাকায়
তিনি বোস ইন্সটিটিউটে রসায়ন বিভাগের প্রধান প্রফেসর অমিতাভ সেনের সঙ্গে একযোগে
গবেষণা শুরু করলেন। সেখানে তিনি ছাত্রদের কাছে পরিচিত হলেন ‘ডাক্তারবাবু’ হিসেবে।
ছুটির দিনেও অনেক রাত পর্যন্ত তাঁকে গবেষণাগারে কাজ করতে দেখা যেত। ১৯৫৬ সালে তিনি
তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য কোট্স্ মেডেল লাভ করেন।
টক্সিন
দুই প্রকারঃ এক্সোটক্সিন অর্থাৎ যা জীবাণুর ভেতর তৈরি হয়ে নিঃসৃত হয় আর
এন্ডোটক্সিন অর্থাৎ যা জীবাণুর কোষ পর্দা থেকে পৃথক হয়ে টক্সিনের কাজ করে। শম্ভুনাথ
প্রথমে ভেবেছিলেন যে কলেরা টক্সিন আসলে এন্ডোটক্সিন কিন্তু তিনি ধারণার উপর নির্ভর
না করে তা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। কলেরা জীবাণুর কোষের বহিরাংশ বিভিন্ন জটিল
পদ্ধতিতে নষ্ট করে প্রাণীদেহে প্রবেশ ঘটিয়ে তিনি দেখলেন যে ডাইরিয়ার পরিস্থিতি
তৈরি হচ্ছে না। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ জীবাণুর ব্যবহারে তা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ কলেরা
টক্সিনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হল এবং আসলে তা এক্সোটক্সিন, এন্ডোটক্সিন নয়! ১৯৬০ সালের গবেষণা পত্রে তিনি কলেরা
টক্সিনের আরও কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তাঁর এই কাজ ডাইরিয়া সংক্রান্ত
টক্সিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়।
কলেরা
টক্সিনকে পিউরিফাই করার যন্ত্রপাতি না থাকায় এই গবেষণা আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তাঁর
পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯৬২ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি শারীরবিদ্যায় ডিএসসি
ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৩-৬৪ নাগাদ ইন্দোনেশিয়াতে পরিচিত ‘এল টর’ জাতের কলেরা জীবাণু
কলকাতায় দেখা দিতে শুরু করে। এই নতুন জাত পুরনো জাতের জীবাণুর অস্তিত্ব কমিয়ে দেয়
এবং নিজের টক্সিন তৈরির ক্ষমতা ক্ষীণ হওয়ায় কলেরার বিস্তার কলকাতা এবং তার
পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কমে যায়। এল টর জাতের এই নয়া বৈশিষ্ট্যও শম্ভুনাথেরই
আবিষ্কার। বোস ইন্সটিটিউটের এমিরিটাস প্রফেসর হিসেবে তিনি এই গবেষণা চালিয়ে যান।
কলেরা টক্সিন সম্পর্কে দু-চার কথা...
কলেরা
টক্সিন ভিব্রিয়ো কলেরি নামক গ্রাম নেগেটিভ (যে কোষ গ্রাম স্টেইন নেয় না) ব্যাক্টেরিয়ার
ভেতর তৈরি হয়। এটি আসলে ছটি প্রোটিনের সমষ্টি অর্থাৎ একটি ‘এ’ এবং পাঁচটি ‘বি’ অংশ
বিশিষ্ট। বি অংশ পাকস্থলীর দেওয়ালের সঙ্গে আটকাতে সাহায্য করে এবং এ অংশ জটিল
রাসায়নিক পদ্ধতির মাধ্যমে পাকস্থলীর দেওয়ালে পাম্প সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে জল,
গুরুত্বপূর্ণ লবণ ইত্যাদি বেড়িয়ে এসে তরল বর্জ্য এবং তদসংক্রান্ত ডাইরিয়া এবং
ডিহাইড্রেশান ঘটায়। পাকস্থলীর দেওয়ালের খোলস পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত টক্সিনের
প্রভাব চলতে থাকে।
উপেক্ষিত শম্ভুনাথ
শম্ভুনাথ
দে তৎকালীন যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, জাতীয় কিংবা
আন্তর্জাতিক, কোনও স্তরেই তিনি বিশেষ বড় কোনও স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু তা তাঁকে
বিজ্ঞান সাধনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে কখনও বিমর্শ করে তোলেনি। বরং সঠিক যন্ত্রপাতির
এবং অর্থসাহায্যের অভাব তাঁকে বেশি বিচলিত করেছিল। ২০১৩ সালে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত
একটি সভায় নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণণ তাঁর বক্তৃতায় শম্ভুনাথ
দের নোবেল না পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে, যথার্থই বলেন যে বিজ্ঞানীর ভূষণ তাঁর জ্ঞান
পিপাসা, পুরষ্কার লালসা নয়।
শম্ভুনাথ
দে-র নাম কখনও প্রস্তাবিত না হওয়ার জন্য নোবেল কমিটি দুঃখপ্রকাশ করেছিল। ১৯৭৮ সালে
৪৩তম নোবেল সিম্পোজিয়ামে কলেরা সম্পর্কে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে শম্ভুনাথ দে
বলেছিলেন যে গবেষণা পত্রে বিজ্ঞানের জটিল ধাঁধাঁগুলির সমাধান উন্মোচনের পূর্ণাঙ্গ
কাহিনী উল্লিখিত থাকেনা; তার জন্যে আবিষ্কারের ইতিহাস অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরী। তবুও
দুঃখের বিষয় এটাই যে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু কিংবা মেঘনাদ
সাহা কেউ-ই নোবেল না পেলেও জনখ্যাতি অর্জন করেছিলেন কিন্তু শম্ভুনাথ দে-র নাম
বিস্মৃতির অতলেই রয়ে গেছে।
২০০৯
সালে কলেরা টক্সিন আবিষ্কারের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে বোস ইন্সটিটিউটে শম্ভুনাথ
দে-র একটি আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন করা হয়।
শম্ভুনাথ দে সম্পর্কে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন
নোবেল
জয়ী বিজ্ঞানী জোশুয়া লেডারবার্গ বলেছেন, ‘ডিহাইড্রেশান কলেরা রোগের প্রধান
বৈশিষ্ট্যে হিসেবে শম্ভুনাথের চিহ্নিতকরণই ওআরএস তৈরির পথ প্রশস্ত করেছিল’।
প্রফেসর পদ্মনাভন বলরামের মতে ‘দে ১৯৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন ভারতের বিজ্ঞানী মহলে
বিশেষ কোনও স্বীকৃতি ছাড়াই কিন্তু তাঁর কাজ বর্তমান প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে
মেগা-প্রোজেক্টের হাতছানি পরিত্যাগ করে দেশের সাধারণ মানুষের দুর্দশা দূরীকরণ
সংক্রান্ত গবেষণায় মনোনিবেশ করতে’। ১৯৮৫ সালে শম্ভুনাথের মৃত্যুর কিছু ঘণ্টা আগে
‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ টেকনোলজি’ পত্রিকার সম্পাদক অরুণাচালাম তাঁকে একটি চিঠি
পাঠান যাতে লেখা ছিল যে ‘কারেন্ট কন্টেন্টস্’ পত্রিকার সম্পাদক ইউজিন গার্ফিল্ড
তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন। শম্ভুনাথের সে চিঠি আর পড়া হয়নি কিন্তু ১৯৮৬
সালে গার্ফিল্ড তাঁর সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখেন যেখানে তাঁর কলেরা টক্সিন
আবিষ্কার এবং টক্সিন বিদ্যায় তাঁর অবদানের কথা তিনি তুলে ধরেন।
কর্মময় জীবনের প্রেরণা কোথা থেকে?-একটি অনুসন্ধান
শম্ভুনাথ
দে কেন কলেরা গবেষণা বেছে নিয়েছিলেন তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আগেই বলা হয়েছে।
দেশভাগ, রিফিউজি সমস্যা এবং রিফিউজি কলোনিগুলিতে কলেরা মহামারীর ফলশ্রুতিতে
হাসপাতালে রোগীদের পরিবারের হাহাকারই যে শম্ভুনাথকে প্রভাবিত করেছিল কলেরা নিরাময়
সংক্রান্ত গবেষণায় নিযুক্ত হতে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, তিনি যখন বোস
ইন্সটিটিউটে যোগ দিচ্ছেন, তার অনেক আগেই আচার্য জগদীশ বসু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ
করেছেন। কিন্তু, আচার্যের ভাইপো দেবেন্দ্র মোহন বসুর সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন।
ডিএম বোসের নেতৃত্বে তখনও বোস ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা জগত সভায় নিজেদের
অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন নিজেদের চমকপ্রদ গবেষণার মাধ্যমে। ফলে, আচার্যের বিজ্ঞান
সাধনার প্রেরণা যে শম্ভুনাথ দে-কেও আজীবন বিজ্ঞান সাধনায় নিমজ্জিত থাকতে উৎসাহ
জুগিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। তবে বোস ইন্সটিটিউটের প্রভাব তাঁর সমগ্র কর্মময়
জীবনের অংশীদার নয় কারণ তিনি ১৯৫৫ সালে এই ইন্সটিটিউটের সান্নিধ্যে আসেন। দেশের আভ্যন্তরীণ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা দূরীকরণে তাঁর অবদান
অনস্বীকার্য। শম্ভুনাথ তাঁর
কর্ম জীবনের সাফল্যের প্রেক্ষিতে সামাজিকভাবে উপেক্ষিত। একপ্রকার লোক চক্ষুর
আড়ালেই তিনি কাজ করেছেন এবং জাতীয় স্তরের বিশেষ সম্মান প্রদান করা না হলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। কিন্তু সমাজ তাঁর নাম বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা
করলেও তাঁর কাজ বারংবার ইতিহাস চর্চার পাতায় ফিরে এসেছে।
তাঁর কাজের সার্থকতা এখানেই। তিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মত
দেশগঠনের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সাধারণ মানুষের সাহায্যার্থেই যে পাশ্চাত্য গবেষণা
পদ্ধতি এবং প্রাচ্যের অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে কাজ করে গেছেন তা সহজেই
অনুমেয়।
বর্তমানে যখন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের অনুকরণ, কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষাকারী গবেষণার প্রতি ঝোঁক এবং তথাকথিত গ্ল্যামার প্রদানকারী বড় বড় বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের সমাধানে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ উদগ্রীব, তখন দেশের বিজ্ঞানের বেহাল দশা, সমাজে কুসংস্কারের প্রাবল্য, দেশের আর্থিক অবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চাহিদার (তথাকথিত গ্ল্যামারহীন ‘ছোট’ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন) সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ গবেষণার অভাব পরিলক্ষিত হওয়াই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানী রিচার্ড লেভিন্স যথার্থই বলেছেন যে তৃতীয় বিশ্বের বিজ্ঞান আসলে প্রথম বিশ্বের ক্যারিকেচার সর্বস্ব বিজ্ঞানেরই ক্যারিকেচারে পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, দেশের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞান সাধনার উন্মেষ ঘটাতে এবং সাধারণ মানুষের চাহিদাগুলি (যেমন, কীটনাশক সমস্যা, পানীয় জলে আর্সেনিক সমস্যা ইত্যাদি) তুলে ধরতে বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাস বা হিস্টোরি অফ সায়েন্স অধ্যয়ন শুরু করা আজ সময়ের দাবী।
Picture Courtesy: Wikipedia
Comments
Post a Comment