‘চাকরী নিয়ে স্কুইড গেম, শাসক তোমায় শেম শেম’: WPA-এর উদ্যোগে বাম শক্তিদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই চলছে

বিশেষ প্রতিবেদন 


Working People’s Alliance (WPA) একটি বাম ঐক্য প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ২০২২ সালে তৈরি হয়েছে। ফ্যাসীবাদকে রুখতে বামপন্থীরা বিভিন্ন ডানপন্থী পার্টির সাথে জোট করে নিজেরা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে আর উল্টোদিকে এই পরিস্থিতির সুযোগে কিছু ডানপন্থী পার্টিদের স্বৈরাচারী বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাচ্ছে। এমতাবস্থায় বাম শক্তিদের নিজ সাংগঠনিক পুষ্টি এবং শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজন সর্ববৃহৎ বাম ঐক্য। এই ঐক্যের ভিত্তি হবে সমালোচনা ও সহায়তার মেলবন্ধন। এই বক্তব্য প্রচারের উদ্দেশ্যেই WPA-এর মঞ্চ হিসেবে পথ চলা শুরু। প্রাথমিকভাবে কিছু ঘটনা ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে মঞ্চের তরফে বিবৃতি প্রকাশিত হতে শুরু করে। বাম ঐক্যের আদর্শগত ভিত্তি প্রচারের উদ্দেশ্যে পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের সময়ে মঞ্চের তরফে বাম ঐক্য প্রসঙ্গে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন WPA-এর প্রস্তুতি কমিটির কনভেনর সাথী সপ্তর্ষি ব্যানার্জী, অধ্যাপক কুণাল চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক সাথী চন্দন প্রামাণিক। 

WPA মঞ্চ শুধু নির্বাচনের সময় বাম ঐক্যের কথা বলছে না বরং আন্দোলনগত ঐক্যের কথাও বলছে। বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন একসাথে এসে এই মঞ্চের সহযোগী হিসাবে রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব নিরসনের উদ্দেশ্যে লড়াই চালাচ্ছে। এই লড়াইয়ের প্রাথমিক স্তরে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া শাণিত করতে মঞ্চের আলোচনা সভায় TUCI-এর পক্ষে সাথী শংকর, CSA-এর পক্ষে সাথী অনন্যা দেব, জনস্বাস্থ্য মোর্চার পক্ষে সাথী পৌলমী এবং PYL-এর পক্ষে সাথী রণদীপ মল্লিক বক্তব্য রাখেন। পরবর্তী পর্যায়ে যাদবপুর ৮বি মোড়ে মঞ্চের তরফে পথসভায় WPA-এর পক্ষে সাথী সপ্তর্ষি ব্যানার্জী, TUCI-এর পক্ষে সাথী শংকর, CSA-এর পক্ষে সাথী অভিজ্ঞান চক্রবর্তী, PYL-এর পক্ষে সাথী বিমল মন্ডল এবং হোসিয়ারি শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক সাথী প্রতীপ নাগ বক্তব্য রাখেন। এরপর এই বছরে ফেব্রুয়ারী মাসে মৌলালী মোড়ে WPA-এর তরফে ‘বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই’ শীর্ষক পথসভা হয় এবং পথসভা চলাকালীন একটি প্রতিনিধি দল নিউ সেক্রেটেরিয়েট বিল্ডিং-এ শ্রম মন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে ডেপুটেশান জমা দেয়। উত্থাপিত দাবীগুলি ছিলঃ ক। সমস্ত সরকারী দপ্তরে ও বেসরকারী ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরী ৩০,০০০ টাকা ধার্য করতে হবে। খ। সমস্ত বর্তমান কন্ট্র্যাক্ট শ্রমিকদের পার্মানেন্ট করতে হবে। কন্ট্র্যাক্ট প্রথা বন্ধ করতে হবে। গ। সমস্ত শূন্যপদ স্বচ্ছ নিয়োগ মারফৎ পূরণ করতে হবে। ঘ। ছাঁটাই, লে অফ, লক আউট বে-আইনী ঘোষণা করতে হবে। ঙ। হকার উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে। চ। ট্রাম পরিষেবা ও পরিবেশ রক্ষার নামে ১৫ বছরের পুরনো যানবাহন বাতিল করা যাবে না এবং পরিবহন শ্রমিকদের স্বার্থে পরিবেশ বান্ধব সরকারী গণপরিবহনকে জোরদার করতে হবে। ছ। কিন্নর-ট্রান্স-ক্যুয়ার মানুষদের সকল স্তরের সব কাজে সমানভাবে নিয়োগ করতে হবে এবং যথাযথ উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। CSA, TUCI, IFTU এবং বহু গণআন্দোলনের সংগঠক ও সমাজকর্মীরা এই কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেন। পথসভায় বক্তব্য রাখেন সাথী সুমিত ঘোষ, সাথী শংকর, সাথী রুমেলা দেব, সাথী শুভাশীষ দাস, সাথী নির্মাল্য ব্যানার্জী, সাথী আশিস দাশগুপ্ত, সাথী শঙ্খশুভ্র বিশ্বাস, সাথী ত্রিদীপ দস্তিদার, সাথী অনন্যা দেব এবং সাথী প্রিয়াংশু দে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সাথী অনলাভ ভট্টাচার্য্য এবং সাথী রণজিৎ মজুমদার। 

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে এই মঞ্চের তরফে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন গণআন্দোলনের সংগঠক সাথী শংকর ও সাথী বুদ্ধদেব ঘোষ, সর্বভারতীয় বাংলা ভাষা মঞ্চের সাথী নীতীশ বিশ্বাস এবং সাংবাদিক সাথী অর্ক ভাদুড়ি। 

সাম্প্রতিক বাম ঐক্য প্রসঙ্গে আলোচনা সভায় CSA-এর পক্ষে সাথী অনন্যা দেব, CPI(M)-এর পক্ষে সাথী বুদ্ধদেব ঘোষ, CPI(ML)ND-এর পক্ষে সাথী চন্দন প্রামাণিক, CPI(ML)Red Star-এর পক্ষে সাথী শংকর এবং Radical Socialist-এর পক্ষে সাথী কুণাল চট্টোপাধ্যায় বক্তব্য রাখেন।   

উল্লেখ্য, যে বাম ঐক্যের বার্তা দিয়ে WPA-এর যাত্রা শুরু, তার সঙ্গে সকল সহযোগী সংগঠন পূর্ণরূপে সহমত না হলেও সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন বামপন্থী দলের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার স্পৃহা এই মঞ্চের কর্মসূচীগুলোকে সফল করেছে। মতপার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মতপার্থক্যের মাঝেও ঐক্যের বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে কিন্তু আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের সদিচ্ছা আশাব্যাঞ্জক। 

মঞ্চে বিভিন্ন মতধারা শুরু থেকেই রয়েছে। একটা মতধারা রয়েছে যে সবসময়ই বাম জোট প্রয়োজন এবং ডানপন্থীদের সাথে হাত মেলানো উচিৎ নয়। আবার আরেকটা মত হচ্ছে যে ফ্যাসিবাদের উত্থান যদি হয়ে থাকে তাহলে তাকে রোখার জন্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ডানপন্থীদের সাথে সংযুক্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে। সেই জোটের ভিত্তি হবে ফ্যাসীবাদী পরিস্থিতিতে বুর্জোয়াদের মধ্যে "উদারনৈতিক" এবং "রক্ষণশীল" ভাগাভাগি। কিন্তু এই ভাগাভাগিটা আজকের দিনের বিশ্বায়িত অর্থনীতির যুগে কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে...

সমাজবিজ্ঞানে একটা নির্দিষ্ট থিওরিই সবসময় সফল হবে বা একটি থিওরিই ঠিক অন্যটা ভুল এমনভাবে বলে দেওয়া যায় না। সে কাজ ইতিহাসের। বিভিন্ন মতধারা রয়েছে – স্ট্যালিনবাদী, ট্রটস্কিপন্থী ইত্যাদি। চিন্তার ভিন্নতা কিন্তু কর্মে ঐক্য, এই দ্বান্দ্বিক মিথস্ক্রিয়াই WPA মঞ্চের মধ্যে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। Working People’s Alliance বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন, পার্টি ও সহায়ক ব্যক্তিদেরকে খেটে খাওয়া মানুষের রাজনীতির ক্ষেত্রে সদর্থক বলে মনে করছে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার আহ্বান জানাচ্ছে।

Comments

Popular posts from this blog

ঘটনার বিবরণ নয়, উপলব্ধি জরুরী; প্রসঙ্গ আর.জি.কর

কর্পোরেট হাঙরদের হাত থেকে লাদাখকে বাঁচাও!

ফিরে দেখা ১০টা বছর: প্রজাতন্ত্রের সংকট