ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হানা, পুঁজির আগ্রাসন নাকি সংকট?
রাজীব চক্রবর্তী
নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতারির ঘটনা মার্কিন আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ নজির। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলার উপর আগ্রাসনের প্রধান উদ্দেশ্য যে সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের লুঠ, তা বলাই বাহুল্য – কারণ মার্কিন সরকার মাদুরোর বিরুদ্ধে যে মাদক পাচারের অভিযোগ করেছে তার কোনো যথাযথ প্রমাণ তাদের হাতে যে নেই, এটা তারা নিজেরাই স্বীকার করে নিয়েছে। অথচ একটা নির্বাচিত সরকারকে তারা অনৈতিকভাবে সে দেশে হানা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটিয়ে ফেলে দিতে চাইছে। গ্রেফতার করে সামরিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মাদুরোকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে। এতে সে দেশের আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোতে যে আঘাত আনা হল, তার নিন্দা জানানোটাই আজ আমাদের প্রধান কর্তব্য।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে সুদীর্ঘকাল মার্কিন আধিপত্য চলেছে। তার বিরুদ্ধে তারা বিগত অন্তত একশ বছর লড়াই চালাচ্ছে। তারা এই লড়াই চালাতে চালাতেই তৈরি করার চেষ্টা করে বিভিন্ন মার্কিন আগ্রাসন বিরোধী সরকার। এই সরকারগুলি চরিত্রগতভাবে গণতান্ত্রিক তথা সমাজতান্ত্রিক বলে নিজেদের এজেন্ডা ঘোষণা করলেও বস্তুত সেই গণতন্ত্র বা সমাজবাদ যেভাবে কার্যকরী করা সম্ভব, সেটা করতে পারেনি। তার প্রত্যক্ষ কারণ তাদের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে একক লড়াই তৈরি করতে তারা অনেকাংশে ব্যর্থ হয়। সেই সুযোগ নিয়ে বারবার আমেরিকা সক্রিয় হয়েছে দখলদারি চালাতে - কখনও চিলি, এল সালভাদোর, আর্জেন্টিনা, পেরু, ব্রাজিল, মেক্সিকো কিম্বা সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা।
এই ভেনেজুয়েলা দখলের ইচ্ছা আমেরিকার বহুযুগ ধরে ছিল। ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর সেখানে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো l ন্যূনতম গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে আধুনিক রাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাবের প্রত্যক্ষ প্রকাশ বস্তুতই পুঁজিবাদের দৈন্যের প্রকাশ। পৃথিবীর তাবত সম্পদ লুঠ করার পরিকল্পনা করছে লুম্পেন পুঁজি। জল-জমি-জঙ্গল দখলের নির্লজ্জ চেষ্টা চালাচ্ছে স্রেফ বাঁচার জন্য। আর এই কারণেই আজকের একমেরু পৃথিবীতে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আক্রমন কখনো ইরাক - আফগানিস্তান - ফিলিস্তিনের উপর আছড়ে পড়ছে। ঠিক তেমনই, ভারতের মত দেশে চলছে কখনো খনি, কখনো নদী, কখনো জঙ্গল, কখনো পাহাড় দখলের তান্ডব। নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে কারণ দারিদ্রসীমা দাঁড়িয়েছে ৬.৪৯ শতাংশ। বিশ্ব পরিস্থিতিও ভয়াবহ।
ট্রটস্কি এই ধরনের আক্রমণের প্রসঙ্গে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর মত ছিল নিরন্তর বিপ্লবের পক্ষে। এই নিরন্তর বিপ্লব ও বিশ্ব বিপ্লবের মাধ্যমেই সমাজতান্ত্রিক চেতনার বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন ছিল, যা সোভিয়েত এক দেশে সমাজবাদ ঘোষণা ও পরে পুঁজিবাদী দেশগুলির সাথে সমঝোতা প্রচারের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দেয়। এরই ফলে পুঁজিবাদী ক্ষমতার আগ্রাসন চলছে ক্রমাগত, শেষ তিরিশ বছরে যা লাগাম ছাড়িয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় এই নতুন বছরের শুরুতেই যে আক্রমণ ট্রাম্প চালালো, তাতে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি একইসাথে এলোমেলো হতে চলেছে। এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এক মহাসংকটে পর্যবসিত হতে পারে। একদিকে যেমন এর ফলে চীনের বাণিজ্যিক ক্ষতি বাড়বে, তেমনি অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও সোভিয়েত জমানা থেকে তাদের বন্ধুত্বের ফলে এই দুই মহাশক্তি পরস্পরের ডাকে সাড়া দেবে। মনে রাখা প্রয়োজন, সম্প্রতি চীন তার হাইড্রোজেন বোমার হুংকার দিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটনকে। অন্যদিকে তথ্য বলছে, বিগত আর্থিক বছরে ভেনেজুয়েলা থেকে অশোধিত তেল সংগ্রহের বাণিজ্য ১৪৫ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে, যা তার আগের আর্থিক বছরে ছিল ১০০ কোটি ডলার। এই অবস্থায় মার্কিন সামরিক বাহিনী আটলান্টিক মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার অয়েল ট্যাঙ্ক আটকে রাশিয়ার সাথে তার বাণিজ্য ব্যহত করে চলেছে। মার্কিন বাণিজ্য নীতি ব্রাজিল ও ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে সংকট তৈরি করছে। কূটনৈতিক মহলের দাবী, চীনের ওপর আক্রমণও তার অন্যতম লক্ষ্য। এমনকি শোনা যাচ্ছে, ভেনেজুয়েলার পরের লক্ষ্য হল ইরান। যে ট্রাম্প বিশ্ব শান্তির জন্য নোবেল দাবী করে চলেছে, তার একের পর এক এই ধরনের প্রনোদনা স্বভাবতই বিশ্বব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ। যুদ্ধের সম্ভাবনা আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইজরায়েল বা ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে যে অশান্তির বাতাবরণ, তাতেও যেভাবে বল্গাহীন অর্থনীতির ঘোড়া ছুটছে, তার থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি প্রায় অসম্ভব। এই সংকট তাই সার্বিকভাবে পুঁজির সংকট, যা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এই সংকট মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারকেই তুমুল সংকটে ফেলবে। বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধানই একমাত্র এই অচলাবস্থার থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে – যার চাবিকাঠি আছে একমাত্র মানুষেরই হাতে। শেষ করব কবি লিওনার্ডো কোহেনকে ধার করে, “There is a crack in everything. That's how the light gets in.”।
[মতামত ব্যক্তিগত]
Comments
Post a Comment