ইস্ট–ওয়েস্ট করিডোর প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলিপুরদুয়ারের কৃষক-ব্যবসায়ীদের লড়াই চলছে

বিশেষ রিপোর্ট 

আলিপুরদুয়ার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইস্ট–ওয়েস্ট করিডোর প্রকল্পের অধীনে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ২০০৪ সালে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI) ইস্ট–ওয়েস্ট করিডোর প্রকল্পের অংশ হিসেবে আলিপুরদুয়ারের NH 31D / NH27 সলসলাবাড়ি থেকে ফালাকাটা পর্যন্ত প্রায় ৪১.৬৫ কিলোমিটার রাস্তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি যাওয়ার দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার কম হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে দাবি করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় আলিপুরদুয়ারের চেনপাড়া, চাপড়ের পাড়, ভেলুক ডাবড়ি এবং সলসলাবাড়ি—এই চারটি মৌজার কৃষিজমি এবং স্থানীয় ব্যবসায়িক এলাকা সরাসরি প্রভাবিত হতে চলেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের জন্য জমি দিতে আপত্তি নেই, কিন্তু তার বিনিময়ে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি এবং ক্ষতিপূরণের অস্বচ্ছতার অভিযোগ থেকেই স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা “ব্যবসায়ী সংগ্রাম সমিতি” এবং কৃষকরা “কৃষি বাস্তু সংগ্রাম কমিটি” গঠন করে আন্দোলনে যুক্ত হন। ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন (The Right to Fair Compensation and Transparency in Land Acquisition, Rehabilitation and Resettlement Act, 2013) অনুযায়ী জমির বর্তমান বাজারমূল্য এবং অন্যান্য ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই আইন অনুসরণ করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত কম মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের কাছে অন্যায় বলে মনে হয়েছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় সরাসরি উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মহাকাল চৌপথি এবং আশপাশের এলাকায় বহু দোকানপাট রাস্তা সম্প্রসারণের কারণে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। দোকানদারদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ না দিয়েই তাদের উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালী কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক সংস্থা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, কিন্তু ছোট দোকানদার, কৃষক এবং বস্তিবাসীদের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্য স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে এবং আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।

গত ১৬ই জানুয়ারী মধ্যরাতে রাস্তার দুই ধারে ৬০-৭০টি দোকান অবরুদ্ধ করে NHAI কর্তৃপক্ষ মাটি ফেলে রেখে চলে যায়। তারপরের দিন সকালবেলা থেকে দোকান খুলতে অসুবিধা হয়, কেউ আর দোকান খুলতে পারেন না। ​তারপরেই ব্যবসায়ীদের অবস্থান কর্মসূচী শুরু হয়। আলিপুরদুয়ার শহর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিবর্গরা ওই স্থানে উপস্থিত হন। ব্যবসায়ীদের মূল দাবী, ন্যাশনাল হাইওয়ে প্রজেক্টের ডিরেক্টর যেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী এবং অধিবাসীদের নাম নথিভুক্ত করে ল্যান্ড অ্যাকুইজিশান দপ্তরে পাঠিয়ে দেন। তাহলে তাঁরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। নতুবা তাঁরা তাঁদের লড়াই চালিয়ে যাবেন। 

ন্যাশনাল হাইওয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের কোন দাবিদাওয়া মানেনি, ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেয়নি, পুনঃস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং রাত দেড়টার সময় ডাম্পারে করে প্রতিটি দোকানের সামনে মাটি ফেলে দিয়ে চলে যায়। রাস্তা ব্লক করে দেয়। পরের দিন সকালে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলের ছাত্রছাত্রী সবারই যাতায়াতে সমস্যা হয়। ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ফোর লেন ব্যবসায়ী সমিতি একটি অবস্থান বিক্ষোভের ডাক দেয় যাতে রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে সবাই উপস্থিত হন। তবে বর্তমান সরকারের স্থানীয় নেতৃত্ব এসে দেখাও করেনি, কাউকে বলেনি মাটি কেন ফেলা হয়েছে, এই নিয়ে কোনো পর্যালোচনা তারা করছে না। কিন্তু সমাজসেবী থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এসে দেখা করেছে। 

৫০ দিন পেরিয়ে গেলেও ব্যবসায়ীরা এখনও দোকান খুলতে পারেননি। আন্দোলনকারীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিশদে জানতে পড়ুন: 

১। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টঃ https://thediligent2018.blogspot.com/2021/05/fact-finding-report.html?m=1

২। https://thediligent2018.blogspot.com/2021/02/blog-post_6.html?m=1

Comments

Popular posts from this blog

Polemics on 'Fractured Freedom': C Sekhar responds to Kobad Ghandy's views

বর্তমান সময়ে বাম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

আম্বেদকরের চোখে - কেন ব্রাহ্মণ্যবাদ শাকাহারী পথ গ্রহণ করল? গো ভক্ষণ নিষিদ্ধকরণের সাথে অস্পৃশ্যতার কি সম্পর্ক রয়েছে?