লিঙ্গ রাজনীতির আলোচনায় অর্থনৈতিক শোষণের প্রশ্ন কি পিছিয়ে পড়ছে?

অনন্যা দেব 

প্রতি বছর ৮ই মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় International Working Women's Day। আজকের পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গায় পুঁজিবাদী চক্রান্তে এই দিনটি শুভেচ্ছা, অনুষ্ঠান বা প্রতীকী উদ্‌যাপনে রূপান্তরিত  হলেও এই দিনের ইতিহাস মূলত শ্রমজীবী নারীদের সংগ্রামের ইতিহাস - কারখানার নারী শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি এবং অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই এই দিনের সূত্রপাত। অর্থাৎ নারী দিবসের শিকড়ে রয়েছে শ্রম, অধিকার এবং অর্থনৈতিক ন্যায়ের দাবি। 

আজও বিশ্বজুড়ে নারীরা নানা ধরনের লিঙ্গ বৈষম্যের মুখোমুখি। সম কাজে অসম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, ঘরের অদেখা শ্রমের বাধ্যতামূলক ভার এবং সমাজের নানা স্তরে বৈষম্য ও সহিংসতা। সাম্প্রতিক সময়ে লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। নারী, ইন্টারসেক্স বা ট্রান্স মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন তাই আজ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: লিঙ্গ বৈষম্যের নানান দিক নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই কি অর্থনৈতিক শোষণ ও অসমতার প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে? কারণ বাস্তবে অধিকাংশ নারীর জীবনে বৈষম্যের সবচেয়ে কঠিন রূপটি প্রকাশ পায় কাজ, মজুরি, সম্পদ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। তাই লিঙ্গ ন্যায়ের প্রশ্নকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে অর্থনৈতিক কাঠামো ও শোষণের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আজকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে নয়াউদারবাদের প্রভাব ক্রমশ উর্ধ্বমুখী হয়েছে (বর্তমানে মন্দা ও যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থার পরিণতি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা সন্দিহান)। এর ফলে বাজার ও মুনাফাই অর্থনীতির একমাত্র কেন্দ্রস্থল, যেখানে শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নটিই যে কোনো সরকারের কাছে অস্বস্তি উদ্রেককারী। তাই মহিলা সহ  ইন্টারসেক্স, ট্রান্স ও অন্যান্য নিপীড়িত লিঙ্গদেরও বেকারত্ব নির্মূলীকরণের ন্যূনতম প্রচেষ্টাও সরকারের তরফ থেকে পরিলক্ষিত নয়। উল্টে সরকারি চাকরি সহ স্থায়ী কাজের সুযোগ কমিয়ে চুক্তিভিত্তিক, অস্থায়ী শ্রমের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে নয়াউদারবাদী শাসনব্যবস্থা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৪৮ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই বড় একটি বৈষম্য রয়েছে। শুধু কাজের সুযোগই কম নয়, অনেক ক্ষেত্রে নারীরা কম মজুরির ও অনিরাপদ কাজে যুক্ত থাকে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩০–৩২ শতাংশের কাছাকাছি, যা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। কর্মরত নারীদের একটি বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক বা অনিরাপদ শ্রমে যুক্ত, যেখানে স্থায়ীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বা শ্রমিকের অধিকার প্রায় নেই। ফলে অর্থনৈতিক সংকট বা চাকরির অনিশ্চয়তা দেখা দিলে নারীরাই প্রথমে কাজ হারায়, অথবা কম মজুরির কাজে তাদের ঠেলে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা - গৃহ শ্রম। রান্না, সন্তান লালনপালন, বয়স্কদের দেখাশোনা, গৃহস্থালির নানা কাজ - এই সমস্ত কাজ সমাজের জন্য অপরিহার্য হলেও এর প্রতি মূল ধারার অর্থনীতির দায় নেই। পশ্চিমবাংলায় লক্ষ্মীর ভান্ডারের নামে যা দেওয়া হচ্ছে, সেটা কি এই গৃহশ্রমের প্রকৃত মূল্য? ট্রেড ইউনিয়নগুলো যে ন্যূনতম মজুরীর দাবী করে তা গৃহ শ্রমের জন্য রাজ্যের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের সরকার দিতে পারবে তো? আসলে বিভিন্ন প্রকল্প - কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী - যা-ই সরকার দিচ্ছে, সেই ভাতা আসলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব থেকে নিজেদের মুখ লুকিয়ে রাখার ঘোমটা মাত্র। অনেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা নারীদের একটি বড় অংশ ঘরের দায়িত্বের কারণেই কাজ করতে পারে না। অর্থাৎ সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো ও লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা একসঙ্গে নারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। লিঙ্গভিত্তিক কাজ ভাগাভাগির বদলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল কাজ, বিশেষ করে বাড়ির কাজ, করার অর্থনৈতিক ও বৌদ্ধিক লড়াই চালাতে হবে। এখানেই নারীদের প্রতি রাষ্ট্রের নীতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। Global Gender Index-এ পিছিয়ে থাকা দেশগুলিতে আশু কর্মসংস্থান বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি করা, বা নারীদের জন্য নিরাপদ ও সমান কর্মপরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এই নীতিগুলি যথেষ্ট শক্তভাবে বাস্তবায়িত হয় না। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আলাদা উদ্যোগ, সমান মজুরি নিশ্চিত করার মত প্রশ্নগুলো প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে থাকে। 

অন্যদিকে নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। শ্রমঘণ্টা কমানো, মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা - এসব অধিকার সহজে আসেনি। এগুলো এসেছে দীর্ঘদিনের শ্রমিক আন্দোলন এবং নারী আন্দোলনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার অর্জনের লড়াই সবসময়ই অর্থনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই বাস্তবতায় লিঙ্গ রাজনীতির আলোচনা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য বা সামাজিক অবমাননা বাস্তব সমস্যা এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রয়োজন। কিন্তু সেই আলোচনার সঙ্গে যদি অর্থনৈতিক শোষণের প্রশ্নটি গুরুত্বের সহিত যুক্ত না হয়, তাহলে সমস্যার মূল কারণটি অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। একজন নারী বা অন্য পিছিয়ে থাকা লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কাজের অধিকারের ওপর। তাই লিঙ্গ সমতার প্রশ্নকে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পরিচয়ের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কাজের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নকে। শ্রমজীবী নারীদের অভিজ্ঞতা, প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষের জীবন বাস্তবতা এবং উৎপাদনের জগতে সকল শ্রমজীবী মানুষের অবদানের স্বীকৃতিকে একত্র করে লিঙ্গ ন্যায় ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নে লড়াই গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিভাজনের রাজনীতি যতই জোরালো হোক, কর্মসংস্থান, জীবিকা ও মর্যাদার প্রশ্নে মানুষের সম্মিলিত অবস্থানই শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করবে। 

Comments

Popular posts from this blog

Polemics on 'Fractured Freedom': C Sekhar responds to Kobad Ghandy's views

বর্তমান সময়ে বাম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

আম্বেদকরের চোখে - কেন ব্রাহ্মণ্যবাদ শাকাহারী পথ গ্রহণ করল? গো ভক্ষণ নিষিদ্ধকরণের সাথে অস্পৃশ্যতার কি সম্পর্ক রয়েছে?