IT Cell ও Godi Creator-দের কুৎসার জবাব: সোনম ওয়াংচুকের লড়াই এবং লাদাখের বাস্তব সত্য

কিংশুক বিশ্বাস


সোনম ওয়াংচুক স্যারের অনশনের ১৮ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর যখন কিছু মূলধারার কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং প্রথম সারির সেলিব্রিটি তাঁর প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই একদল 'Godi Creator' ময়দানে নেমেছে এক নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে। গদি মিডিয়ার চেনা মুখগুলোর মতোই, এরাও সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে যেকোনো ন্যায্য আন্দোলনকে কুৎসা করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত। 

এদের নতুন প্রোপাগান্ডা হলো: "লাদাখকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা না দিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করায় নাকি সোনম ওয়াংচুকের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল হয়নি! তাই তিনি এখন দিল্লিতে এসে দেশের যুবসমাজকে উসকাচ্ছেন।"

ভুল তথ্য ও কুৎসায় বিভ্রান্ত হওয়ার আগে, আসুন কিছু অকাট্য তথ্যের মুখোমুখি হওয়া যাক—লাদাখবাসীদের স্বায়ত্তশাসন ও অধিকারের দাবি কি আদেও অন্যায্য?

১. দেশপ্রেম নাকি ক্ষমতার লোভ?​

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা মনে আছে? যখন পুরো দেশ ক্ষোভে ফুঁসছিল, তখন এই লাদাখের মাটি থেকেই সোনম ওয়াংচুকের সেই দূরদর্শী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছিল—"বুলেট সে নেহি, ওয়ালেট সে।" তিনি ডাক দিয়েছিলেন চীনের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চীনা পণ্য বর্জন করার। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন, যে টাকা চীন ভারতের বাজার থেকে কামাই করে, সেই টাকা দিয়েই তারা সীমান্তে আমাদের জওয়ানদের দিকে বন্দুক তাক করে।

​যিনি মাইনাস ডিগ্রি ঠান্ডায় দেশের জওয়ানদের সুরক্ষার জন্য নিজের প্রযুক্তিতে "সৌরচালিত সামরিক তাঁবু" বানিয়ে উপহার দেন, তাঁর দেশপ্রেম আর সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো ধৃষ্টতা এই স্ক্রিপ্টেড ক্রিয়েটরদের ছাড়া আর কারোর হতে পারে না।

​২. চীন বনাম কর্পোরেট: লাদাখ গ্রাসের দুই ফ্রন্ট

​সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চীন লাদাখের প্রায় ৩৮,০০০ বর্গ কিলোমিটার জমি (আকসাই চীন) অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সীমান্তের সাধারণ মানুষের ওপর। ওয়াংচুকের মূল অভিযোগ ছিল, সীমান্তে চীন ক্রমাগত ভারতের জমি ও মেষপালকদের (Nomads) ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি গ্রাস করে চলেছে।

​আজ যারা ওয়াংচুককে 'দেশবিরোধী' বলে গালি দিচ্ছেন, তারা কি বোঝেন তাঁর চীনের বিরুদ্ধে লড়াই আর বর্তমান সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বরূপ?

• বাইরের শত্রু: চীন সীমান্ত দিয়ে লাদাখের জমি ও চারণভূমি গ্রাস করছে।

• ​ভেতরের লোভ: অন্যদিকে, বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা না থাকায় বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে লাদাখের পাহাড় কেটে খনি বানানোর রাস্তা তৈরি হচ্ছে।

​ড্রাগন এসে জমি দখল করলেও লাদাখ ধ্বংস হবে, আবার কর্পোরেট এসে পাহাড় কাটলেও লাদাখের হিমবাহ গলে পুরো উত্তর ভারত তীব্র জলসংকটে পড়বে।

​৩. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আসল ইতিহাস

​২০১৯ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল (Sixth Schedule) দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতি স্রেফ ধামাচাপা দেওয়া হয়।

​লাদাখকে সরাসরি বিধানসভাহীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার মূল উদ্দেশ্যই হলো—সেখানকার স্থানীয় জনজাতির জীবন, জীবিকা, জমি ও পরিবেশের তোয়াক্কা না করে সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া, যেখানে লাদাখবাসীর নিজস্ব কোনো আইনি অধিকার থাকবে না।

​সোনম ওয়াংচুকের লড়াই লাদাখের স্থানীয় জনগণের  জীবন, জীবিকা পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্রের জন্য  তাঁর লড়াই সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষার মাধ্যমে লাদাখের আদিবাসীদের জমি, সংস্কৃতি ও ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা—তা কোনো বিদেশী শত্রুর হাত থেকেই হোক বা দেশী লোভী কর্পোরেটের হাত থেকে।

​যুবসমাজ উসকানি দেখছে না, যুবসমাজ দেখছে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিকের আপসহীন লড়াই। প্রোপাগান্ডা বন্ধ হোক, সত্যের জয় হোক।

মতামত ব্যক্তিগত

চিত্র সূত্র: PTI

লেখক গণআন্দোলনের কর্মী ও সংগঠক। 


Comments

Popular posts from this blog

প্রসঙ্গ চিন

Polemics on 'Fractured Freedom': C Sekhar responds to Kobad Ghandy's views

‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’! - বাম রাজনীতির পর্যবেক্ষণ