কেরলমে রাজনৈতিক পালাবদল
অদ্রিরাজ তালুকদার
কেরলমে বিধানসভা নির্বাচনে মূলত দুই পক্ষ - লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (LDF) ও ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (UDF)। স্বাধীনতার পর থেকে ভোটারদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা গেছে - একবার LDF, পরেরবার UDF। এই ৫ বছর অন্তর “anti-incumbency” বা শাসকবিরোধী মনোভাব কেরলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। যদিও ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে LDF ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে এই ধারা ভেঙেছিল। কিন্তু এবার ২০২৬-এ এসে তারা UDF-এর কাছে পরাজিত হয়েছে। ফলে নির্বাচনে কেরলমের ৫ বছর অন্তর পালাবদলের প্রবণতা এখনও কার্যকর।
UDF-এর নেতৃত্বে রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে রয়েছে, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (IUML), কেরালা কংগ্রেসের বিভিন্ন অংশ এবং কিছু আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক দল। কেরলমে জাতীয় কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবে মধ্যবিত্ত, সংখ্যালঘু, উচ্চবর্ণ হিন্দু এবং শহুরে ভোটব্যাঙ্কের উপর নির্ভর করেছে। তারা পরিকাঠামোর উন্নয়ন, বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ নির্মাণ ও প্রশাসনিক আধুনিকীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। UDF-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক IUML মূলত মালাবার অঞ্চলের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় স্তরের সাংগঠনিক শক্তির কারণে দলটি কেরলমের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী। এদেরকে পরিচয়সত্ত্বাভিত্তিক বুর্জোয়া দল বলা যেতে পারে। এছাড়াও রেভল্যুশনারী সোশ্যালিস্ট পার্টি (RSP) এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক UDF জোটের শরিক। এই সংমিশ্রণের ফলে UDF একদিকে বাজারমুখী অর্থনীতিকে সমর্থন করে, অন্যদিকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও পুরোপুরি ভাঙতে চায় না।
অন্যদিকে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা LDF-এর শরিক কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা CPI(M), কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা CPI, RSP ভেঙে বেরিয়ে আসা রেভল্যুশনারী সোশ্যালিস্ট পার্টি (লেনিনিস্ট), রাষ্ট্রীয় জনতা দল বা RJD, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লিগ, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা NCP (শরদ পাওয়ার গোষ্ঠী), NCP থেকে বেরিয়ে আসা একটি গোষ্ঠী ও কেরালা কংগ্রেসের দুটি ফ্যাকশান। এই ক্ষুদ্র বুর্জোয়া দলগুলোর উপস্থিতিতে LDF-কে পূর্ণরূপে শ্রমিক শ্রেণীর জোট বলা যায় না। তা সত্ত্বেও ভূমি সংস্কার, শ্রমিক আন্দোলন, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও জনকল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে কেরলমে সামাজিক উন্নয়নের বুনিয়াদ স্থাপন করেছে বিগত LDF সরকারগুলি। সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি এবং সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন উন্নত হলেও বাণিজ্য ও শিল্পের অভাব ও বেকারত্বের সমস্যা বিদ্যমান। ফলে সাম্প্রতিককালে LDF-ও Ease of Doing Business মডেল গ্রহণ করে এবং নয়াউদারবাদের দিকে পা বাড়ায়। কেরলমে কর্মস্থান, জনপরিসরে কর্পোরেটীকরণের প্রসার চোখে পড়ার মতো।
ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) চিরকালই কেরলমে দূর্বল। তা সত্ত্বেও গত দু'দশক ধরে তারা নির্দিষ্ট অংশের ভোটারের মধ্যে ধারাবাহিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০১৬-র পর থেকে তারা প্রায় ১১% ভোট ধরে রেখেছে এবং এই বছর BJP তিনটে আসনে জয় লাভ করেছে। আরএসএস-এর দীর্ঘদিনের সংগঠন কেরলম জুড়ে সক্রিয় রয়েছে। BDJS এবং কর্পোরেট কিটেক্স গোষ্ঠী (বিশদে পড়তে: https://thediligent2018.blogspot.com/2021/01/blog-post_28.html) BJP-র দোসর হয়েছে।
কেরলমের গুরুত্বপূর্ণ নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সম্প্রদায় (অবর্ণ/OBC) হল এঝাভা সমাজ, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০%। ঐতিহাসিকভাবে এদের একটি বড় অংশ বামপন্থীদের সমর্থক ছিল। বিভিন্ন নিম্নবর্ণের ঐক্য সংগঠন শ্রী নারায়ণ ধর্ম পরিপালন যোগম (SNDP)-তে এঝাভাদেরও নেতৃত্ব রয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী। অতীতে জাতপাত-বিরোধী আন্দোলনে, কৃষক আন্দোলনে ও বিভিন্ন প্রগতিশীল সমাজ সংস্কার আন্দোলনে তাদের সদর্থক ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিককালে তাদের একাংশ বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। ১৯৭৬ সালে SNDP-র রাজনৈতিক অঙ্গ হিসেবে তৈরি হয়েছিল Socialist Republican Party যা কালক্রমে দূর্বল হয়ে পড়ে। তারপর SNDP-র রাজনৈতিক অঙ্গ হিসেবে ২০২১-এ তৈরি হয় ভারত ধর্ম জন সেনা (BDJS), যারা বর্তমানে NDA-এর শরিক। কেরলমে পরিচয়সত্ত্বাভিত্তিক দলের পেছনে এক এক সম্প্রদায়ের ভোট পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। IUML-এর ক্ষেত্রেও সেটা দেখা গেছে। তবে এখনও কেরলমে বিজেপি বা এনডিএ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। শক্তিশালী বাম ঐতিহ্য, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বড় উপস্থিতি এবং সামাজিক কল্যাণের রাজনীতি এর কারণ।
মানবোন্নয়ন, গ্রাম ও শহরের বিভেদ বিমোচন, পরিকাঠামো ইত্যাদি বিষয়ে এগিয়ে থাকা কেরলম সমাজে বর্তমানে কর্মসংস্থান, শিল্প এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দাবী রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, কেরলমের অর্থনীতির বিরাট অংশ বাংলা, আসাম, বিহার থেকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতির অংশ নয় বলে এবং স্থায়ী বাসিন্দা নয় বলে এই রাজ্যে তাদের রাজনৈতিক কন্ঠ নেই। ট্রেড ইউনিয়নগুলিও পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে খুব একটা ভাবিত নয়। কেরলম থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজে যাওয়া অভিবাসীদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা রাজ্যের আয়ের একটা বড় অংশ। তাই বর্তমানে বেকারত্বের প্রশ্নটি অন্যতম। এক্ষেত্রে দুই বড় নির্বাচনী ফ্রন্টই কর্পোরেট বিনিয়োগ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপসহ নয়াউদারবাদী সংস্কারের দিকে অগ্রসর হয়েছে। এর বাইরে কোনো বিকল্প সম্ভাবনা বামপন্থীরা এখনও দর্শাতে পারেনি। অন্যদিকে সরকারি ব্যর্থতা এবং ভোটারদের সম্প্রদায়ভিত্তিকভাবে একজোট হওয়ার ফায়দা তুলে ভবিষ্যতে এনডিএ নিজের শক্তিবৃদ্ধি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের সচেতন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অদ্রিরাজ তালুকদার ভারতের প্রগতিশীল শিক্ষার্থী ফেডারেশানের সদস্য।

Comments
Post a Comment