২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভা নির্বাচনের ফলাফলের পর্যালোচনা
~The Diligent Editorial Team
১। চরম দুর্নীতি, ব্যাপক বেকারত্ব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারী কর্মসংস্থান হ্রাস, ঠিকা প্রথার প্রসার, কাজের অভাবে অন্যত্র যুব সমাজের প্রবসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র পরিষদের গুন্ডাগিরি, পুলিশ ও বিডিও-দের দলীয় ক্যাডারে পরিণত করা, তোলাবাজি ইত্যাদি তৃণমূল কংগ্রেসকে এই রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র করে তুলেছিল। তাই তাদের পরাজয়ের বহুবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম হল প্রশাসনিক ব্যর্থতা। সীমিত ক্ষমতায় রাজ্য সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নয়াউদারবাদী বৈশিষ্ট্যই তাদের জনতার কাছে বিরাগভাজন হওয়ার জন্য দায়ী। একব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং নির্দিষ্ট আদর্শবিহীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারে থাকাকালীন সূক্ষ্মভাবে নয়াউদারবাদী প্রয়োগ হিসেবে সরকারী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংস সাধন, সামগ্রিকভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়া, ঠিকা কর্মী নিয়োগ, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘুরপথে তোল্লাই দেওয়া ইত্যাদি কাজ করে গেছে। আবার বামপন্থী বিরোধীদের স্বল্প পরিসরে মিটিং-মিছিলও করতে দিয়েছে। অর্থাৎ তারা সেই কাজই করেছে যা জাতীয় কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে করত। এটাই স্বাভাবিক কারণ তৃণমূল জনতা ঘরানার আঞ্চলিক দল নয়, কংগ্রেস ভেঙেই তার জন্ম। আম জনতাকে উত্যক্ত করেও তৃণমূল এতদিন যে টিকে ছিল, তার বহু কারণের মধ্যে একটি অবশ্যই তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। ২০১১ সালে যখন তারা বামফ্রন্টকে হারিয়ে জেতে, তার কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন সরকারের পক্ষে রবার্ট ব্লেক মমতার সাথে দেখা করতে এসেছিল!
২। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৪ লোক সভা নির্বাচন হয়েছিল ১৯শে এপ্রিল থেকে ১লা জুন পর্যন্ত। অভয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ৯ই আগস্ট, ২০২৪। সুপ্রিম কোর্ট এসএসসি ২০১৬-র প্যানেল বাতিল করে দেয় ৩রা এপ্রিল, ২০২৫। সাউথ ক্যালকাটা ল কলেজের ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২৫শে জুন, ২০২৫। অর্থাৎ ২০২৪-এর লোক সভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ২০১৯-এর তুলনায় ৭টা আসন বেশি পাওয়া এবং বিজেপির ৬টা কমে যাওয়া, সবই হয়েছিল উক্ত তিনটে ঘটনা ঘটার আগে। ২০২৪-এর লোক সভা থেকে ২০২৬-এর রাজ্য বিধান সভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে পার্থক্য হল বারংবার তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতিদের দ্বারা নারী নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা এবং সরকারী নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত ধুলোয় মিশে যাওয়া। অভয়ার হত্যাকারীদের প্রমাণ লোপাটে তৃণমূলের তৎপরতা, এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযুক্ত পুলিশকর্তা ও সরকার পক্ষের উকিলকে রাজ্য সভার সাংসদ করা, তৃণমূল ছাত্র পারিষদের নেতৃত্বের দ্বারা কলেজ ক্যাম্পাসে গণধর্ষণ, কোর্টের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওএমআর শিট প্রকাশ না করা - অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে রাজ্যে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল। তারই প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনী ফলাফলে।
৩। তৃণমূলের জয়ী ৮০টা আসনের মধ্যে শুধুমাত্র বোলপুর, ধনেখালী, পাথরপ্রতিমা ও জয়নগরে মুসলমান জনসংখ্যা ২০% বা তার বেশি নয়। তবে বহু আসনের প্রবণতা থেকে স্পষ্ট যে মুসলমানরা সর্বত্র কেবল তৃণমূল কংগ্রেসকেই ভোট দিয়েছে, এমনটা নয়। অঞ্চল বিশেষে জাতীয় কংগ্রেস, আইএসএফ, এজেইউপি, সিপিআই(এম)-এর দিকেও তাদের সমর্থন গিয়েছে। তা ৬টা আসন বাদে অন্যত্র এই বিরোধীদের জয়ের রাস্তা খুলে দেয়নি, বরং বহু আসনে তৃণমূলের পরাজয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দু প্রধান আসন যেমন পূর্বাঞ্চলের পুরুলিয়া, শালবনি প্রভৃতি, উত্তরবঙ্গের কুমারগ্রাম, ফালাকাটা প্রভৃতি, দক্ষিণবঙ্গের গাইঘাটা, কল্যাণী প্রভৃতি, যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ৮০% বা তার বেশি, সেখানে বিজেপির বিজয় পতাকা উড়েছে। দলিত ও আদিবাসীদেরও সমর্থন পেয়েছে বিজেপি। ২০২১-এর ধর্মীয় মেরুকরণ, ২০২৪-২৫ সময়কালের তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও ২০২৬-এর এসআইআর-এর নিরিখে, তার রূপ পাল্টেছে। হিন্দু সংহতি বেড়েছে আর মুসলমানরা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হয়েছে। এসআইআর বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি নির্যাতন এবং তৃণমূলের প্রতীকী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাদের প্রতি একবগ্গাভাবে সংখ্যালঘু সমর্থন অটুট থাকেনি আর ঘুষপেটিয়া-রোহিঙ্গা তত্ত্বের প্রভাবে বিজেপির প্রতি হিন্দু জনতার একটা বড় অংশের আস্থা বেড়েছে। নিজেদের দুর্নীতির কথা মাথায় রেখে বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে হাজতবাসের ভয়ে তৃণমূল এমপি-রা বিজেপির একের পর এক জনবিরোধী বিল সংসদে পাশ করে দিয়েছে। তারা রাজ্য বিজেপির বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক বক্তব্য আইনি পথে মোকাবিলা না করে কেবল বাকযুদ্ধে সীমাবদ্ধ রেখেছিল আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে একমাত্র ত্রাতা সাজার চেষ্টা করেছিল। অন্যদিকে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় মন্দির বানিয়ে হিন্দুত্বের রাজনীতিতেও তৃণমূল হাত সেঁকছিল। এবার তারা দু'দিক থেকেই ছ্যাঁকা খেয়েছে। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সাংস্কৃতিক অবস্থান ইত্যাদি যতটা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে ইস্যু, ততটা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর একটা বড় অংশের কাছে ইস্যু নয়। তাই বাঙালী জাতীয়তা বা আঞ্চলিকতা দিয়েও তৃণমূল নিজেদের জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। মুক্তমনা, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ একেবারে নেই, এমনটা নয়, কিন্তু বিগত ১৫ বছরে এ রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে পরিবর্তন এসেছে। যুব সমাজের একটা বড় অংশ ধর্মভীরু হয়ে উঠেছে এবং 'সনাতনী' প্রচারে প্রভাবিত হয়েছে। ২০২৪-২৫-এর তৃণমূলের প্রশাসনিক অপদার্থতা সরকার বদলের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। তাই নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি এসআইআর বাদে আর কোনও সাম্প্রদায়িক বক্তব্য রাখেনি। বরং তাদের মুখে কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তার বাণী শোনা গেছে। আর কংগ্রেস বা বামপন্থীরা কোনও বিকল্প দাঁড় না করাতে পারায়, ধর্মীয় সংহতি এই পালাবদলের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।
৪। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জনবিরোধী নীতির প্রভাবকে খাটো করা যাবে না। কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ভোট গণনার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যোগেন্দ্র যাদব থেকে রাহুল গান্ধী অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার বাতাবরণে ১৯৩ জন বিরোধী সাংসদের কাছে নির্বাচন কমিশন প্রধানের আস্থা হারানো স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। ২০২৬ বিধান সভা নির্বাচনের রাজ্য মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকই বর্তমান বিজেপি সরকারের চিফ সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন!
৫। এবারের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ক্ষেত্রে এসআইআর অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর ছিল। ঘুষপেটিয়া ও রোহিঙ্গা কেন্দ্রিক অনুপ্রবেশ তত্ত্বের প্রসারে তা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। হিন্দু জনতার একাংশের এই অনুপ্রবেশ তত্ত্বের প্রতি সমর্থন সমাজে ফ্যাসীবাদী গণমনস্তত্ত্বের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা জোগায়। উল্লেখ্য, ৪৯টি আসনে এসআইআর কেন্দ্রিক ভোটার বাতিলের সংখ্যা বিজয়ী দলের জয়ের ব্যবধানের থেকে বেশি ছিল! এর মধ্যে ২৬টি আসনে বিজেপি, ২১টিতে তৃণমূল এবং ২টিতে কংগ্রেস জয়ী হয়েছে।
৬। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির ভারতীয় পার্টনারদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক পুঁজিপতি এবং ক্ষুদ্র পুঁজির মালিকদের লড়াই-এর কারণেই তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির পক্ষে বাড়ন্ত জনসমর্থনকে গণমাধ্যমে এবং শহরাঞ্চলে কিছু মাত্রায় ঢাকতে সফল হয়েছিল। আর বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির ভারতীয় চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অর্থাৎ বিজেপি-র নির্বাচনী জয়ের পরে উল্লাস এমনই যে দেশব্যাপী বিজেপির বাংলা বিজয়ের মিছিল বেরিয়েছে। গো বলয়ের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ এই রাজ্যের স্বার্থের ঊর্দ্ধে গিয়ে রক্ষা করা হয় কিনা, সেটাই এখন দেখার।
৭। বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট! ভারতবর্ষের একটি অঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয়ের এত আন্তর্জাতিক গুরুত্ব? প্রশ্ন উঠবে, ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং আশপাশের পড়শি দেশ সম্পর্কে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের কি পরিকল্পনা রয়েছে? তাছাড়া এই শুভেচ্ছা বার্তা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুদ্ধোন্মাদনার প্রতি বিজেপি নেতৃত্বের মাথা নুইয়ে রাখার আহ্বানও হয়ে থাকতে পারে। আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন।
৮। কিছু বিজনেস হাউসের স্বার্থ রক্ষা করতে জাতীয় কংগ্রেস বাম জোট থেকে বেরিয়ে এলেও তারা মাত্র দুটো আসন পেয়েছে। অধীর চৌধুরী এবং মৌসম বেনজির নূর রাজ্য রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বামফ্রন্ট কংগ্রেস থেকে দূরত্ব রাখেনি বরং কংগ্রেসই তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। অর্থাৎ আদর্শগত অবস্থান এবং সময়ের দাবী মেনে বামফ্রন্ট সর্ববৃহৎ বাম ঐক্যের পথে হাঁটেনি। আর ওই পথে হাঁটেনি বলেই তৃণমূল থেকে আগত আরাবুল সহ অন্যান্য দুর্বৃত্তদের জায়গা দেওয়া সত্ত্বেও তারা এবারেও আইএসএফ-কে দোসর হিসেবে রেখেছে। ধর্মীয় সংহতি আর গুন্ডামি ছাড়া আইএসএফ-কে আরাবুলের আর কিছুই দেওয়ার ছিল না। ফলে ধর্মগুরু পরিচালিত এই দলও যে পরোক্ষে সাম্প্রদায়িক তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর এবারে বেঙ্গালুরুতে দাঙ্গায় অভিযুক্ত ও কেরলমে বামপন্থীদের হত্যায় অভিযুক্ত এসডিপিআই-কে একটি আসনে নিজেদের নির্বাচনী প্রতীকে লড়তে দিয়েছে আইএসএফ এবং সিপিআই(এম) তাতে সমর্থনও করেছে! ক্যানিং পূর্ব আসনে সিপিআই(এম)-এর আয়েশি জীবনে অভ্যস্ত কৃষক নেতাকে খুনী আরাবুলের পক্ষে স্তুতি পাঠ করতে শোনা গেছে! বিজেপির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাঝে সাম্প্রদায়িক আইএসএফ-কে দোসর করে বামফ্রন্ট তার সমর্থন ভিত্তি খোয়াচ্ছে - বাঙালী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বামেদের বদলে আইএসএফ-এর সংগঠন বাড়ছে আর বাকি জায়গায় বিজেপি তার বিভাজনের রাজনীতির অজুহাত খুঁজে পাচ্ছে। সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক বাবরী মসজিদের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মুখ হয়ে ওঠা হুমায়ন কবীরের সাথে দেখা করতে যেতে পেরেছে কিন্তু ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড বিরোধী আন্দোলন করে আসা জমি জীবিকা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির নেতৃত্বের সাথে সদর্থক আলোচনা করার সময় পায়নি। ফলস্বরূপ ভাঙড়ে বামেদের সংগঠন আইএসএফ খেয়ে নিয়েছে আর আরাবুল এসে নতুন করে সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করছে।
৯। বামফ্রন্টের শরীক দলেদের নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে ভাবতে হবে। সিপিআই(এম)-এর লেজুড়বৃত্তি করে এবং ভোটের সময়ে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাদের তরী পার হবে না। একমাত্র আরএসপি ভাঙড়ের জমি কমিটির প্রার্থীর পক্ষে সদর্থক অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সিপিআই বা ফরওয়ার্ড ব্লক আইএসএফ-এর বিরুদ্ধে যথাক্রমে নন্দীগ্রাম ও মধ্যমগ্রামে প্রার্থী দিলেও ভাঙড় সম্পর্কে চুপ থেকেছে। অর্থাৎ সিপিআই ও ফরওয়ার্ড ব্লকের আইএসএফ-এর বিরোধিতা ছিল কেবল নিজেদের দলীয় স্বার্থে। সামগ্রিকভাবে কন্ট্রাডিকশান ও কলিউশানের রাজনীতি করতে গিয়ে তারা রাজ্য রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। অবস্থানগত স্বচ্ছতা এবং লড়াই-আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আর জমি নীতি, ক্ষতিপূরণ বা নন্দীগ্রামের ঘটনার এতদিনেও নৈতিক দায় স্বীকার না করে নন্দীগ্রাম আসনটা আইএসএফ-কে দিয়ে সিপিআই(এম) কার্যত নিজের ইগোর ম্যাসাজ করতে চেয়েছে। তবে এবার জলঙ্গি ও ভগবানগোলায় সিপিআই(এম) দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আর সামগ্রিকভাবে বাম-আইএসএফ জোট ৬.৭% ভোট পেয়েছে। যাই হোক, এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ডোমকলে সিপিআই(এম) প্রার্থী কমরেড মোস্তাফিজুর রহমান (রানা) জয়ী হয়েছেন। লকডাউনের সময়ে তিনি পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন এবং এসআইআর-এর সময়ে পীড়িত মানুষদের বিনামূল্যে আইনি সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন। খেটে খাওয়া মানুষের লড়াইয়ে সঙ্গী হয়েই রানাদা জয়ী হয়েছেন। বাংলার বিধান সভায় তিনি খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মসংস্থানের পক্ষে, কর্মক্ষেত্রে অধিকারের পক্ষে এবং বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে সওয়াল করবেন, এই আশা রাখি।
১০। তৃণমূলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেই বিজেপি চলে আসবে - তৃণমূলের দ্বারা আর্থিকভাবে মদতপুষ্ট বামেদের এই অবস্থানকে জুতো মেরে রাজ্যের সাধারণ মানুষ তৃণমূলকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। অরাজনৈতিক, ক্ষমতা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যবিহীন, পেশাভিত্তিক আন্দোলনের মডেল অভয়ার ন্যায়বিচারের লড়াইতে অ্যাডপশানের বিরোধিতা না করে বামেরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, অভয়ার মা বিজেপির পতাকা তলে দাঁড়িয়ে জয়ী হয়েছে আর প্রশ্ন উঠেছে যে প্রতীকী আন্দোলন করে সুদীপ্ত গুপ্ত-মৈদুল মিদ্যা-আনিস খানদের ন্যায়বিচার মিলেছে কিনা। প্রয়োজন ছিল তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে বামপন্থী পরিসর ও বিকল্প তৈরি করা। করা হয়নি। বিগত ৩-৪ বছরে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নামে হয়েছে কেবল পথসভা, তাও আবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। আর নির্বাচন নিয়ে বাকি আগুনখোর বিপ্লবীদের অনীহা এসআইআর-এর প্রেক্ষাপটে এমন পর্যায় গিয়ে পৌঁছায় যে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে তারা যে মানসিকভাবে আগেই হেরে গেছে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০২১-এ অমন অবস্থানে না থাকলেও এবারে কবর থেকে ২০২১-এর 'নো ভোট টু বিজেপি' স্লোগান তুলে এনে কেবল ভাষাগত ফাইনটিউনিং করে একদল তন্ত্র সাধনায় বসেছে। অন্য আরেক দল ২০২১-এ 'নো ভোট টু বিজেপি'-র পক্ষে থেকে, এবার নয়াউদারবাদের বিরোধিতায় বাম প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও গোঁজ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে, নোটার থেকেও কম ভোট পেয়েছে। এসইউসিআই এই একই দোষে দোষী। সিঙ্গুর নীতির প্রেক্ষিতে কেউ সিপিআই(এম)-কে ওই আঙ্গিকে সমালোচনা করতেই পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে যে কোন কারণে তৃণমূলকে ঠিকা নিয়োগ ও নিয়োগ দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে সেই একই সমালোচনার মুখে ফেলা হবে না। এখন অবস্থা বেগতিক বুঝে মমতা বামেদের ডাকাডাকি করলেও লিবারেশান সহ বাকি দলেরা কি অবস্থান নেয় সেটাই এখন দেখার। তৃণমূলের নেতৃত্বে হকার উচ্ছেদের সময় বামেদের একাংশের (দল ও ছোট গ্রুপ) ন্যক্কারজনক অবস্থান ছিল। তারা তৃণমূলের সাথে সমঝোতার নতুন কি লাইন নামায় সেটাই এখন দেখার।
লড়াই কঠিন - সরাসরি ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনতার কাছে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার লড়াই, নিপীড়িত মুসলমান, আদিবাসী ও দলিত জনতার অধিকার রক্ষার লড়াই, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংস্কারের লড়াই, খেটে খাওয়ার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লড়াই। দেশব্যাপী লড়াই-আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটা রাজ্যে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
Updated: 11:46pm 15/05/2026

Comments
Post a Comment