কর্পোরেটরা কি সাম্যের গান গাইছে?
পৌলমী
ভোটের সময় নীতি নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দল আজকাল তাদের বিভিন্ন ডোল প্রকল্পের বিজ্ঞাপন করে। বর্তমানে আমাদের রাজ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার বিতর্কটি বেশ জোরদার হয়েছে। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে টাকার পরিমাণ বেশি আর পাওয়ার শর্তগুলো আরও কঠিন। লক্ষ্মী ভাণ্ডারে টাকার পরিমাণ কম ছিল, পাওয়ার শর্তগুলো আরও হাল্কা। আদতে কিন্তু দুটি প্রকল্পের মধ্যে বিশেষ ফারাক নেই। কারণ দুটোই আধার নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ সুবিধা। এবং বিগত দশ বছর যাবৎ আমাদের দেশে আধার নম্বরের সঙ্গে রোজগার, সঞ্চয়, সম্পত্তি, টিকাকরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতি যাবতীয় তথ্যের সংযুক্তিকরণ করা হচ্ছে। আধার সংযুক্ত সরকারি অতিরিক্ত সুবিধা বা বীমা প্রকল্পগুলি এই একই পদ্ধতিতে আজকাল পৃথিবী জুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে। আমাদের দেশে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিপরীতে এই ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প কি আদৌ কোন অর্থনৈতিক সমাধান? পুরোনো বোতলে নতুন মদ। নয়াউদারনীতির উদারতার মুখোশ যখন নতুন শতাব্দীতে ক্রমশ খসে পড়ছিল তখন Philanthro-Capitalism তত্ত্বের আমদানি। কর্পোরেটরা নিজেরাই এখন বলছে যে তারা মানব দরদী। এই তত্ত্বের হাত ধরে যে অর্থনৈতিক মডেল আজকের প্রায় সব দেশে লাগু হচ্ছে তাতে অর্থনৈতিক অসাম্য দূরীকরণে এধরনের সামান্য আর্থিক সহায়তা প্রকল্প জনপ্রিয় হচ্ছে।
মানবসমাজে সাম্যের ধারনা নতুন নয়। স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে দাসবিদ্রোহ ছিল দাসমালিক এবং দাসদের মধ্যে অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই। মধ্যযুগের চিনে কৃষকেরা বারে বারে করলোভী ভূস্বামী বা রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পৃথিবী জুড়ে বহু জায়গায় সামন্তযুগের অবসানের কালে বহু কৃষক অভ্যুত্থানের কথা জানা যায়। বর্তমান যুগে কার্ল মার্ক্স থেকে জন লেনন - অনেকেই নিজের মতো করে মানবসমাজে সাম্যের ধারনা আমাদের দিয়েছেন। মার্ক্সীয় তত্ত্বে সাম্যের ধারনা নিয়ে চর্চা হয়েছে বিস্তর। আমরা বরং জন লেননের কথায় আসি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আবহে লেখা তাঁর 'ইম্যাজিন' গানে জন লেনন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর যে কল্পচিত্র রচনা করেছেন সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু নেই। দেশের সীমানা বিলুপ্ত হয়েছে। বিশ্ব শান্তির আবহে মনুষ্য জগত থেকে ক্ষুধা ও লোভ বিদায় নিয়েছে। কিন্তু লেননের কথায় ও সুরে বোঝা যায় যে সেই স্বপ্নের সাম্য সুদূর পরাহত, বহু দূরের ভবিষ্যতে কখনো হয়তো এমনটা ঘটবে।
আমরা দেখি ২০১১ সালে প্রকাশিত যুবল নোয়া হারারি তাঁর 'সেপিয়েন্স' গ্রন্থে এই সাম্যের প্রসঙ্গে অনেক বেশি আশাবাদী। তিনি নির্দ্বিধায় ঘোষণা করছেন যে বর্তমান পৃথিবীর নীতি নির্ধারকেরা - রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা - অধিকাংশই হলেন শান্তিপ্রিয় (১)। আমরা ইতিহাসে এমন এক সময়ে বসবাস করছি যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিশেষ একটা হচ্ছে না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মানুষকে অসামান্য সব প্রযুক্তি উপহার দিয়েছে - জিন টেকনোলজি, রোবোটিকস, AI, মানব-মেশিন
(humanoid) প্রযুক্তি। হারারির মতে এই প্রযুক্তিগুলির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে মানবজাতির সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু হারারি মনে করছেন যে মানবজাতি প্রধানত দুটি গভীর সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে না পারলে অচিরেই মানবজাতির অস্তিত্ব সংকট দেখা দিতে পারে। প্রথম সমস্যাটি হল মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশের সংকট বা anthropogenic climate crisis। দ্বিতীয় সমস্যাটি আরও গভীর। এবং সে বিষয়ে হারারি আরেকটি বই লিখেছেন – Homo
Deus : A Brief History of Tomorrow। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে AI ও অন্যান্য প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বহু মানুষ কর্মহীন হবে। এইসব মানুষকে হারারি বলছেন
economically useless people। 'অপ্রয়োজনীয়' এই গোষ্ঠী সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বলে হারারি আশঙ্কা করছেন। 'অপ্রয়োজনীয়' মানুষদের ম্যানেজ করা এই মুহূর্তে সভ্যতার সব থেকে বড় সংকট বলে হারারি মনে করছেন।
শিল্পকলা আর তত্ত্বের জগত থেকে আসা যাক বাস্তবের মাটিতে। আমরা দেখতে পাচ্ছি হারারির আশঙ্কা সমর্থন করছে জাতি সংঘ (UN), বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF), বিশ্ব ব্যাঙ্ক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, G20, প্রভৃতি তাবড় আন্তঃসরকারি সংস্থা। ২০১৫ সালে পরবর্তী ১৫বছরের জন্য জাতি সংঘ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে। লক্ষ্যমাত্রাগুলি UN Sustainable Development Goals for 2030 বা UN SDGs 2030 Agenda হিসেবে পরিচিত। বিশ্ব ব্যাঙ্ক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা,বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, G20, প্রত্যেকেই অবিকৃতভাবে এই ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করছে। আন্তঃসরকারি সংস্থাগুলি জানাচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র নিরাময়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে (২)। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অসাম্য দূর করতে চায় আন্তঃসরকারি সংস্থাগুলি। আমরা দেখেছি বর্তমান বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের বিষয়ে হারারি যথেষ্ট আশাবাদী। দেখা যাক অমিত শক্তিধর এইসব আন্তঃসরকারি সংস্থা আরও কি দাবি রাখছে। নয়া উদারনীতির যুগে মাল্টি ন্যাশানাল কর্পোরেটরা কি সত্যিই খুব উদার হয়ে উঠেছে?
২০১৬ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে (৩)। ২০৩০ সালের এক স্বপ্নের নগরীর গল্প। সেই শহরে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্ত হয়েছে। তাই ধনী দরিদ্রের ফারাক নেই। সকলের প্রয়োজনীয় খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান এবং অন্যান্য যাবতীয় চাহিদার দ্রব্য প্রয়োজন অনুসারে ডেলিভারি ব্যবস্থা আছে। সবুজ শক্তিতে চলে সেই শহর। কারোর ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। সকলেই গণপরিবহন ব্যবহার করে। নতুন শহরে সকলেই খুশি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এই শহরে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত সময় আর ব্যক্তিগত নেই, তা সমানেই রেকর্ড হচ্ছে। কিন্তু এই রেকর্ড করা ব্যক্তিগত তথ্য কেউ কারোর বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করলে আর কিসের সমস্যা! আর দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষ বাস করে এরকম অত্যাধুনিক স্বপ্ননগরীর বাইরে, ছোট ছোট গ্রামে। কারণ এই নয়া জীবনযাত্রায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে তারা অপারগ। কিন্তু স্বপ্ননগরীর সমৃদ্ধি থেকে তারা বঞ্চিত।
এবার দেখা যাক স্বপ্নপুরনের উদ্দেশ্যে যেসব লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে সেগুলির হাল হকিকত।
আসা যাক ক্ষুধার প্রশ্নে। ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনে জাতি সংঘের তরফে জানানো হয়েছে যে ১৯৬০-২০১৫ সময়কালে পৃথিবী জুড়ে কৃষি সম্পদের উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েছে তার তুলনায় অনেক কম হারে। জাতি সংঘের হিসাব মতে ২০১৫ সালে মানবজাতি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃষিসম্পদ উৎপাদন করছিল। অথচ পৃথিবীর বহু মানুষ আজও অভুক্ত। ২০২২ সালে জাতি সংঘ আরেকটি প্রতিবেদনে স্বীকার করছে যে পৃথিবী জুড়ে ক্ষুধিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাহলে ২০১৫ সালে গৃহীত দারিদ্র নিরাময়ের লক্ষ্যমাত্রা কি হল? আদৌ কি বাস্তবে ২০৩০ সালে দারিদ্রবিহীন কল্পজগতকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে? যে কর্পোরেট লবি বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিভিন্ন আন্তঃসরকারি বা অতিরাষ্ট্রিক সংস্থার নীতি নির্ধারণ করে তারা কি দারিদ্র বা ক্ষুধা নিয়ে আদৌ চিন্তিত?
দেখা যাচ্ছে ক্ষুধা নিরাময়ের প্রশ্নে অতিরাষ্ট্রিক সংস্থা কখনো সরাসরি খাদ্যের বা সম্পদের বন্টন নিয়ে কথা বলে না। তাহলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা হোর্ডিং এর সমস্যার সমাধান হবে কি করে! আরও অবাক লাগে যখন দেখি অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদন হচ্ছে তা স্বীকার করার পরেও তারা জিন-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলন বাড়ানোর নিদান দেয়। খাদ্য সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে বিতর্কিত জিন প্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যতিরেকে নতুন কোন ভাবনা এইসব জনদরদী ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি কিন্তু আমাদের দিচ্ছে না (৪)।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে কর্মহীন গোষ্ঠীকে ম্যানেজ করার ক্ষেত্রে নানান জনদরদী প্রকল্প ইতিমধ্যে বহু দেশে চালু আছে। ভারতবর্ষে ÚPA ১ জমানায় ঢাকঢোল পিটিয়ে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালু হয়। বেকার সমস্যাকে সামাল দিতে নিতান্ত অক্ষম সরকারের জনদরদী ইমেজ ধরে রাখতে পরবর্তী সমস্ত সরকার ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালু রেখেছে। পাশাপাশি রয়েছে ডোল অর্থনীতি। আমাদের দেশে কম বেশি সব রাজ্যেই 'জন হিতকারী' নানান দানের প্রকল্প রয়েছে। এবিষয়ে দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী ও উদারপন্থী দলগুলির নীতিতে কোন তফাৎ নেই। আমাদের রাজ্যে কন্যাশ্রী, যুবশ্রী প্রভৃতি প্রকল্পের দিকে তাকালে দেখবো যে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের হাতে নিয়মিত সামান্য কিছু টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকার যদি সমাজে NGO মার্কা দানসত্র খুলে বসে তাহলে কোন বিপদ আছে কি? অনেকেই মনে করেন সাধারন মানুষের হাতে এই সামান্য অতিরিক্ত অর্থ তুলে দেওয়ার ফলে স্থানীয় অর্থনীতির সামান্য হলেও উন্নতি ঘটে। যেমন বহু পরিবার লক্ষ্মীশ্রীর টাকা জমিয়ে রাখে পুজো বা অন্য কোন বড় উৎসবের সময় খরচ করার জন্য। অনেকে হয়তো এই অতিরিক্ত অর্থ জমিয়ে নিজের প্রয়োজন বা পছন্দ মতো কেনাকাটা করে। এখন প্রশ্ন হল এই দানের অর্থ আসছে কোথা থেকে? কোন সরকারি খাতে বরাদ্দ কমিয়ে সেই টাকা দানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে? আমাদের দেশ ও রাজ্যে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য - মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদি খাতে সরকারি বরাদ্দ ক্রমশ কমছে। গত শতাব্দীর সত্তর বা আশির দশকে আমাদের রাজ্যে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে 'সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য' স্লোগান পরিবর্তিত হয়ে আজকে দাঁড়িয়েছে 'সকলের জন্য স্বাস্থ্য বীমা'। কেবলমাত্র হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সাথী বা অন্যান্য স্বাস্থ্য বীমা কাজে লাগে।
ডোল অর্থনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলে আমরা পাই সার্বজনীন মৌলিক আয় বা universal
basic income (UBI) এর ধারনা। হারারি বর্ণিত economically useless people দের ম্যানেজ করার জন্য সার্বজনীন মৌলিক আয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে অনেক 'শান্তিপ্রিয়' ' নীতিনির্ধারক' মনে করছেন।
সার্বজনীন মৌলিক আয় অর্থাৎ প্রত্যেক নাগরিক প্রতি মাসে নিঃশর্ত ভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পাবেন। দেশের সরকার প্রত্যেক নাগরিককে সম পরিমাণ অর্থ প্রতি মাসে দিতে বাধ্য থাকবে। দারিদ্র্য দূরীকরণে এই অর্থ কাজে আসবে। মধ্যবিত্ত তাদের শ্রমের বিনিময়ে যে রোজগার তার বাইরে অতিরিক্ত খরচ করার জন্য কিছু অর্থ পাবে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ এই টাকা দেশের অর্থনীতিতে ঢালবে। টাকার পরিমাণ এতোই ক্ষুদ্র হবে যে উচ্চবিত্তের রোজগার বা খরচের কোন তারতম্য ঘটবে না।
সার্বজনীন মৌলিক আয় প্রকল্পের আওতায় মানুষকে যে টাকা নিয়মিত ভাবে দেওয়া হবে যে কোন দেশে তার হিসাব কিছুটা আলাদা হলেও মোটের ওপর বলা যায় এই অর্থের পরিমাণ হবে একজন মানুষকে ঠিক দারিদ্র্য সীমায় রাখতে হলে তার যা রোজগার হওয়া উচিত তার কাছাকাছি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের UBI সংক্রান্ত নথিতে প্রতি মাসে মার্কিন নাগরিকদের মাথা পিছু হাজার ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে (৫)।
২০১৬-১৭ সালে ভারতের ইকনমিক সার্ভে রিপোর্ট বলছে প্রতি নাগরিককে বছরে ৭৬২০ টাকা UBI প্রকল্পের অধীনে দেওয়ার কথা। বর্তমান অর্থনীতির নিরিখে সেই হিসেবে দাঁড়ায় বছরে মাথা পিছু এগারো হাজার টাকার কাছাকাছি। সরকারি রিপোর্টে বলা হচ্ছে অন্যান্য welfare
scheme এর পরিবর্তে UBI প্রকল্প চালু করলে সার্বিক ভাবে দারিদ্র দূরীকরণে লাভ হতে পারে বিস্তর (৬)।
সরকার রিপোর্টে জানাচ্ছে যেসব জেলায় বহু মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে সেইসব জেলায় কেন্দ্রীয় সরকারি সহায়তা বা welfare scheme ঠিকঠাক মানুষের কাছে পৌঁছয় না। দরিদ্রদের সাহায্য করার আরও কার্যকর উপায় হল ইউবিআই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি তাদের অর্থ সরবরাহ করা।
UBI-এর সফল বাস্তবায়নের নীতি এবং পূর্বশর্তগুলি অন্বেষণ করে, সমীক্ষাটি উল্লেখ করে যে একটি সফল UBI-এর জন্য দুটি পূর্বশর্ত হল: (ক) কার্যকরী JAM (জন ধন, আধার এবং মোবাইল) ব্যবস্থা কারণ এর ফলে একজন সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে নিশ্চিত করে সরাসরি নগদ স্থানান্তর সম্ভবপর হয় এবং (খ) ব্যয় কেন্দ্র-রাজ্য আলোচনা করে ভাগাভাগি করে নেবে। যদিও সরকার জানাচ্ছে এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ UBI প্রকল্প চালু করার আগে আরও আলোচনার প্রয়োজন।
পৃথিবীর কোন দেশেই UBI প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ রূপে শুরু হয়নি। প্রশ্ন একটাই - এই বিপুল অর্থ আসবে অন্য কোন খাতে ব্যয় সংকোচন করে? পথনির্দেশ অবশ্য আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক রিপোর্টে রয়েছে। ওয়াশিংটন কনসেনসাস পরবর্তী যুগে পুঁজির সংকটের মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে অতিরাষ্ট্রিক সংস্থাগুলির নেতৃত্বে সদস্য জাতি রাষ্ট্রগুলি এক ঝাঁক austerity measure গ্রহণ করতে শুরু করে। গত প্রায় তিন দশক ধরে জাতীয় জিডিপির নিরিখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমেছে। সরকারি বরাদ্দ তলানিতে পৌঁছনর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সাধারন মানুষ প্রাইভেট কোম্পানি বা কর্পোরেটের দ্বারস্থ হচ্ছে। যাদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্য কেনার ব্যক্তিগত সামর্থ্য নেই তারা ক্রমশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ভারতবর্ষে তো বটেই, আমাদের রাজ্যে ২০২০ পরবর্তী সময়ে সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়া এবং স্কুলছুটের সংখ্যা মারাত্বক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। তিলোত্তমা আন্দোলনের সময় আমরা দেখেছি রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসার অব্যবস্থা। গত কয়েক দশক ধরে হাসপাতালগুলিতে প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধন হয়েছে সামান্যই। পরিবর্তে ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মীদের শুন্যপদ ক্রমশই বাড়ছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। ব্যাঙ্ক, রেল, খনি, কলকারখানা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্র বহু বছর ধরে খোলা বাজারে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
সার্বজনীন মৌলিক আয় স্কিমে মানুষকে যে যৎসামান্য অর্থ তুলে দেওয়া হবে তাতে রুটি, কাপড়, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি কোন মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্র সরকার যদি ক্রমশ হাত গুটিয়ে নেয় তাহলে নয়া উদারনীতির মুক্ত বাজারে মাল্টি ন্যাশানাল কর্পোরেটদের কব্জায় আসবে এইসব ক্ষেত্র। কর্ম সংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত এই শ্রেণি সরকারি ডোলের ভরসায় কোনক্রমে জীবন কাটাবে। আর জন ধন - আধার - মোবাইলের নজরদারির আওতার বাইরে যারা তারা তো দেশের নাগরিক নয়। তারা দারিদ্র সীমার নিচে থাকলেও জাতীয় গরিবির পরিসংখ্যানের হিসেবে তারা থাকবে না। মানব উন্নয়নের এই নয়া মডেলে গরিবি দূর করার মজার সমাধান 'গরীব হটাও'। আমরা দেশ জুড়ে আজ দেখছি সাধারন মানুষকে এনআরসি প্রক্রিয়ায় বেনাগরিক করার চক্রান্ত। বেনাগরিকের কিন্তু অন্যান্য নাগরিক অধিকারের সঙ্গে প্রতিবাদ করার অধিকারটুকুও আর থাকে না। এরাই বোধ করি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সেই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা প্রাবন্ধিকের স্বপ্নের শহরের বাইরে থাকে।
সত্তরের দশকে জন লেনন বিশ্ব শান্তির গান গাইলেও তিনি নিজে স্বীকার করছেন তা স্বপ্ন। কিন্তু ২০১১ সালে হারারি নির্দ্বিধায় ঘোষণা করছেন যে বর্তমান কাল অখণ্ড শান্তির সময়। মাঝের এই চল্লিশ বছরে কর্পোরেট পুঁজি কিন্তু কোনদিন ধারাবাহিক বিশ্বমন্দা বা ধারাবাহিক যুদ্ধের চেনা ছকের বাইরে বেরোতে পারে নি। কিন্তু এই বিগত চল্লিশ বছরে কর্পোরেট পুঁজি জাতি রাষ্ট্রগুলিকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অতি রাষ্ট্রিক সংস্থার মাধ্যমে মাল্টি ন্যাশানাল বা ট্রান্স ন্যাশানাল পুঁজি জাতীয় নীতি নির্ধারকের ভূমিকা নিচ্ছে। কর্পোরেট শাসন জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে যে আমরা বোধ করি সম্মিলিত চেতনা বিলুপ্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। তাই হারারি বর্ণিত 'ভাল' কর্পোরেটদের গল্প আজ আমাদের সত্যি বলে মনে হয়। পরিকল্পিত অর্থনীতির বদলে কিছু আকাশ কুসুম কাহিনী ফেঁদে UN, WTO, WEF, প্রভৃতি সংস্থা ও তদানুগামী সরকারেরা দায় ঝেড়ে ফেলে। আর আমরাও তা মেনে নিই।
সূত্র
১। Sapiens -
Yuval Noah Harari; pg 379
“Ours is the
first time in history that the world is dominated by a peace-loving elite –
politicians, business people, intellectuals and artists who genuinely see war
as both evil and avoidable. (There were pacifists in the past, such as the
early Christians, but in the rare cases that they gained power, they tended to
forget about their requirement to ‘turn the other cheek’.)’’
২। UN
sustainable development goals for 2030
https://www.un.org/sustainabledevelopment/development-agenda-retired/
৩। Welcome to
2030. I own nothing, have no privacy, and life has never been better.
https://medium.com/world-economic-forum/welcome-to-2030-i-own-nothing-have-no-privacy-and-life-has-never-been-better-ee2eed62f710
৪। এক বিশ্ব, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ - পৌলমী
https://jsm.org.in/bn/bojhapora/aamaader-kathaa/73-one-earth-one-family-one-future
৫। Why We Should
All Have a Basic Income, World Economic Forum https://share.google/M0aOlzoZ1pGPvqYme
৬। Economic
Survey: Universal Basic Income (UBI) Scheme an alternative to plethora of State
subsidies for poverty alleviation; https://share.google/h8P9roX7MDGG5wUB6
পৌলমী জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী। প্রবন্ধটি ২০২৬ বইমেলা সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়োপযোগী করা হয়েছে। মতামত ব্যক্তিগত।

Comments
Post a Comment