আরশোলা যুদ্ধ জিতেছে, যে ইকোনমিক গ্রোথ তাদের জন্ম দিয়েছিল, তা এখনও থামেনি
শঙ্খশুভ্র বিশ্বাস
১৫ মে, ভারতের প্রধান বিচারপতি একটি প্রতারণামূলক আইনি প্রমাণপত্র সংক্রান্ত আদালত অবমাননার রুটিন মামলা শুনতে গিয়ে দেশের বেকার যুবসমাজ নিয়ে একটি মন্তব্য করে বসলেন। তিনি বললেন, তারা আরশোলার মতো, ব্যবস্থার শরীরে বেঁচে থাকা পরজীবী। এমন মন্তব্য একজন ক্ষমতাবান মানুষই করতে পারেন, যিনি ধরে নেন ক্ষমতার শিখরে থাকায় কেউ তাঁদের ছুঁতে পারবেনা আর সাধারণ যুবদের কথায় কিছু আসে যায় না। অভিজিৎ দীপকে, এই অপমানকেই একটা নতুন নাম দিলেন, ককরোচ জনতা পার্টি। তিন দিনের মধ্যেই তার অনুগামী দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেল। জুলাইয়ের মধ্যেই তার ইনস্টাগ্রাম অনুগামীর সংখ্যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির চেয়েও বেশি হয়ে গেল। তাদের কোনও দফতর ছিল না, কোনও তহবিল ছিল না, একটা রসিকতা ছাড়া কোনও ইস্তেহারও ছিল না, একটা রসিকতা যা কিছুতেই ফুরোতে চাইছিল না।
তারপর, ৪ জুন, নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট, যে পরীক্ষা ঠিক করে দেয় ভারতের ভবিষ্যৎ চিকিৎসক কারা হবেন, তা আরও একবার প্রশ্নফাঁসের কবলে পড়ল। প্রায় বাইশ লক্ষ তরুণ-তরুণী বসেছিলেন এক লক্ষ ত্রিশ হাজার আসনের জন্য। এটা প্রথম নয়। গত সাত বছরে এটি সত্তরতম ফাঁস, আর এবার সেই রসিকতা তার অভিযোগের জায়গাটা খুঁজে পেল। যা এতদিন একটা অনলাইন মিম ছিল, তা হয়ে উঠল দিল্লীতে প্রতিবাদের ক্ষেত্র, তারপর জন্তর মন্তরে মিছিল, তারপর সরাসরি সংসদের দিকে পদযাত্রা, কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জের মধ্যে দিয়ে, আর সবটাই সরাসরি সম্প্রচারিত হল সেই একই ফোনগুলোয়, যেগুলো দিয়ে এই আন্দোলন তৈরি হয়েছিল। ২৫ জুলাই, একজন বিচারপতি তাদের পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করার আট সপ্তাহ পর, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। নরেন্দ্র মোদীর বারো বছরের শাসনকালে এই প্রথমবার একটি রাজপথের আন্দোলন কোনও মন্ত্রীর পদ কেড়ে নিল।
ব্যঙ্গ - এই অংশটাই সহজে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তারপর আন্দোলনের উল্কাসম গতি এবং শেষে অপ্রত্যাশিত জয়। কিন্তু এটা গল্পের ছোট অংশ মাত্র। আসল প্রশ্ন হল, কেন এই আন্দোলন গড়ে উঠল এই ছাত্রছাত্রীদের হাত ধরে এবং অর্থনৈতিক সংকটের এই মুহূর্তে কিই বা এর গুরুত্ব। এই গল্পের শুরু কোনও বিচারপতির মন্দ রসিকতায় নয়। তার শুরু একটা ইকোনমিক গ্রোথ থেকে।
যে প্রজন্মের কাছ থেকে কেউ লড়াই আশা করেনি
গত এক দশক ধরে ভারতের জেনারেশন জ়েড তার প্রবীণদের কাছ থেকে একধরনের নির্দিষ্ট অবজ্ঞা সহ্য করে আসছে; খুব বেশি অনলাইননির্ভর, অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নিজের একটা ব্যক্তিগত পরিচিতি গড়ে তোলাতেই এত ব্যস্ত যে তার চেয়ে বড় কিছুর জন্য সংগঠিত হওয়ার সময় নেই। ককরোচ আন্দোলন এই অভিযোগগুলো খণ্ডন করেনি বরং তাকে অন্য খাতে বইয়ে দিয়েছে। যে প্রবণতাগুলোকে এই প্রজন্মের আত্মকেন্দ্রিকতার প্রমাণ বলে ধরা হত - ব্যঙ্গ, মিমের ভাষায় সাবলীলতা, দর্শকের সামনে একটা পরিচিতি তৈরি করে ফেলার সহজাত দক্ষতা, সেগুলোই হয়ে উঠল আন্দোলনের আসল অস্ত্র। একজন ছাত্র গান্ধীর ছদ্মবেশে মিছিলে হাঁটলেন, কিছু বললেন না; যে রাজনৈতিক কাজটা সাধারণত ভাষা করে, সেই কাজ করল একটা ছবি। আন্দোলনকারীরা নিজেদের ভিডিয়ো করলেন, নিরাসক্ত ব্যঙ্গের সুরে "স্বীকার" করলেন যে চিনা এজেন্টরা তাঁদের বাসভাড়া বাবদ ষাট টাকা আর পাকিস্তানি এজেন্টরা দুপুরের খাবারের জন্য চল্লিশ টাকা পাঠিয়েছে। রাষ্ট্র যে দেশদ্রোহের অভিযোগ তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাকে ব্যঙ্গ দিয়েই আগেভাগে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হল। এটা আকস্মিক কোনও চতুরতা ছিল না। এই প্রজন্ম যে ভাষায় নিজেদের অনুগামী তৈরি করতে শিখেছিল, সেই একই ভাষা দিয়েই তারা প্রথমবার রাস্তায় জনতাকে ধরে রাখতে পারল, এটাই তাদের আবিষ্কার।
এই আন্দোলন আসলে যা প্রকাশ করে দিল তাদের ব্যঙ্গের আড়ালে, তা হল ভয়, এক নির্দিষ্ট, প্রজন্মগত, দীর্ঘদিন অব্যক্ত থাকা ভয়, যা বহু বছর ধরে ব্যক্তিগত স্তরে ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু কোনওদিন সমষ্টিগত রূপ পায়নি। এটা দারিদ্র্যের বিমূর্ত ভয় নয়, যাকে ভারতীয় রাজনীতি বরাবরই অন্য কারও সমস্যা বলে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছে। এ হল, যা যা করতে বলা হয়েছিল সব করেও, পরীক্ষা, কোচিং, ডিগ্রি, শেষমেশ কিছুই যখন কোনও ভবিষ্যতে রূপান্তরিত হয় না, তার ভয়। এই অনুভূতিকে ঘিরে সংগঠিত হওয়া ক্ষুধার চেয়েও কঠিন, কারণ বাইরে থেকে দেখতে এটা বঞ্চনার মতো দেখায় না। কাগজে-কলমে এটা দেখতে সাফল্যেরই মতো। আন্দোলনের আসল সাফল্য এটাই, একই মুহূর্তে এই ব্যক্তিগত, লজ্জাজনক ভয়কে দৃশ্যমান আর সমষ্টিগত করে তোলা।
যে ইকোনমিক গ্রোথ নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে
এই গোটা প্রেক্ষাপটটা কোনও অর্থনৈতিক সংকট নয়, যে অর্থে কথাটা সাধারণত ব্যবহৃত হয়। গত অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৭ শতাংশ, আগের বছরের ৭.১ শতাংশ থেকে বেশি, আর সাম্প্রতিকতম ত্রৈমাসিকে তা দাঁড়িয়েছে ৭.৮ শতাংশ, তিন বছরের সর্বোচ্চ, বাজারের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। গত তিন বছরের মধ্যে দুই বছর উৎপাদন শিল্পে বৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে পৌঁছেছে। সরকারের নিজস্ব শ্রমশক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সামগ্রিক বেকারত্বের হার নেমে এসেছে ৩.১ শতাংশে, আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থমন্ত্রক যে হেডলাইন পরিসংখ্যানগুলো তুলে ধরতে ভালোবাসে, তার প্রতিটিতেই ভারতের গতি ধীর হচ্ছে না বরং বাড়ছে। আর তা সত্ত্বেও, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশ, যাঁরা লিখতে-পড়তে জানেন না তাঁদের তুলনায় নয়গুণ বেশি। দেশের সবচেয়ে সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানেও, স্নাতক ব্যাচের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ক্যাম্পাস প্লেসমেন্টে নাম লিখিয়েও কিছু পায়নি। ২০২১ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে, ভারতের তেইশটি আইআইটি-র মধ্যে বাইশটিতে প্লেসমেন্টের হার কমেছে, কোথাও কোথাও কুড়ি শতাংশের বেশি; ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতকদের সামগ্রিক প্লেসমেন্টের হার ৯০ শতাংশের ওপর থেকে নেমে এসেছে ৮০ শতাংশের সামান্য ওপরে। যুব বেকারত্বের হার সারা দেশে মাস ভেদে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, আর শহরাঞ্চলে তা প্রায় ১৮ শতাংশ, সরকার যে হার প্রচার করে তার প্রায় ছয়গুণ। এগুলো এমন কোনও অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয় যা জাতীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে স্থবির করছে। এগুলো এমন একটা অর্থনীতির পরিসংখ্যান, যা শিখে ফেলেছে কীভাবে জনগণের জীবনের উন্নয়ন ছাড়াই জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধি হতে পারে।
এই বিষয়টা নিয়ে থমকে ভাবার দরকার আছে, ঠিক এই কারণেই যে এটা কোনও ধাঁধা নয়, এটা একটা প্রক্রিয়া। এসবের কোনওটাই কোনও মুদ্রা সংকট বা রাজকোষীয় আতঙ্কের প্রেক্ষাপটে ঘটছে না, যদিও তার ওপর সত্যিকারের চাপ আছে, আর সেটা সৎভাবে স্বীকার করাই ভালো। এই বসন্তে তেলের ধাক্কা আর বিদেশি পুঁজির ঐতিহাসিক পলায়নের চাপে ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম নেমে গিয়েছে সর্বকালের সর্বনিম্নে। বৈদেশিক ঋণ ৭৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই চাপগুলো বাস্তব, আর এগুলো যে পরিবারে একজন স্নাতক আছে তার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহকে আরও তীব্র করে তোলে। কিন্তু এই তথ্যগুলো ওয়েদার মাত্র, ক্লাইমেট নয়। ওয়েদার হল এই যে যোগ্যতা তৈরি হচ্ছে চাকরির চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে কারণ রাষ্ট্রের পক্ষে যোগ্যতা জোগানো সস্তা, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন, একটা প্রবেশিকা পরীক্ষা, একটা সার্টিফিকেট, কিন্তু চাকরি সস্তা নয়। এই পরিস্থিতিতে ইকোনমিক গ্রোথ যা তৈরি করে, তা ভাগ করে নেওয়া সমৃদ্ধি নয়। এটা তৈরি করে যোগ্যতাসম্পন্ন, কর্মহীন মানুষের এক ক্রমবর্ধমান জলাধার, এমন মানুষ, যাঁরা কোনওদিন একটা চাকরি পাওয়ার আগেই শ্রেণিচ্যুত হয়ে গিয়েছেন, আর পঁচিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই যে সত্যিটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাঁদের কাছে।
এক নতুন অনিরাপদ শ্রেণি
এখানেই বিজেপি হিসেবটা মেলাতে পারেনি। ২০০০-এর দশক থেকে এর নির্বাচনী জোট মূলত দাঁড়িয়ে আছে ভারতের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর, ঠিক এই কারণেই যে সংগঠিত বাম আর জাত-ভিত্তিক দলগুলোর শ্রমিকশ্রেণি আর গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে অনেক পুরনো, অনেক মজবুত ভিত্তি ছিল। এই উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জোট তৈরি হয়েছিল একটা নির্দিষ্ট প্রজন্মের হাতে, যে প্রজন্ম বড় হয়ে উঠেছিল ভারতের উদারীকরণের বছরগুলোয় আর সফটওয়্যার রপ্তানি বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে, আর নয়া-উদারনৈতিক বৃদ্ধির সিঁড়ি বেয়ে নিজের পরিবারকে একটা স্থায়ী, যদিও সামান্য, স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছে দিতে পেরেছিল। সেই প্রজন্মের কাছে বাজার অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি মোটের ওপর রক্ষিত হয়েছিল। জাঁকজমকপূর্ণভাবে নয়, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যভাবে। সাম্প্রদায়িকতা এই শ্রেণির জন্য দীর্ঘদিন ধরে সত্যিকারের কাজ করে এসেছে, আর কেন করেছে, সেটা সৎভাবে বলা দরকার। সংখ্যাগুরু পরিচিতি একধরনের মানসিক ক্ষতিপূরণ দিত - মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি, দেশের স্বতঃসিদ্ধ নাগরিক হওয়ার অনুভূতি। তাই সামান্য কিন্তু ক্রমবর্ধমান বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি সে স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিতে পারত। সে স্বাচ্ছন্দ্যের বিকল্প নয়, তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু এই সমীকরণ তখনই টিকে থাকে যখন বস্তুগত ভিত্তিটা অটুট থাকে। যা জোগানোর কথা তার কখনও ছিল না তা হল একটা আয়। সাম্প্রদায়িকতা আয়ের ব্যবস্থা করতে পারে না। একটা প্রজন্মের নিরাপত্তাহীনতা যখন বিমূর্ত থাকা বন্ধ করে একটা ফাঁকা প্লেসমেন্ট সেল বা একটা বাতিল পরীক্ষার মতোই কংক্রিট হয়ে ওঠে, তখন সাম্প্রদায়িক সান্ত্বনার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আর কিছুই থাকে না, আর ঠিক সেখানেই, যেখানে সে একদা সবচেয়ে ভালো কাজ করত, তার দখল আলগা হতে শুরু করে।
তাদের সন্তানেরা একই আদর্শগত চিত্রনাট্যে বাঁচছে, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা গল্পে। বহু বছর ধরে এটাই মেনে নেওয়া হয়েছে যে প্রত্যেক স্নাতক চাকরি পাবে না। বাজার এটাকে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। নয়া-উদারনৈতিক কমন সেন্স একে স্বাভাবিক করে দিয়েছিল, একটা বিশাল দেশের শ্রমবাজার এভাবেই তো চলে বলে। যেটা এই মেনে নেওয়াকে ভেঙে দিল, তা হল কারা চাকরি না পাওয়া শুরু করল। যখন কোনও তৃতীয় সারির কলেজ থেকে বেরনো ছাত্রছাত্রীরা চাকরি পায় না, তখন রাষ্ট্রের কাছে দুই দশকের অভিজ্ঞতা আছে সেই গল্পকে নিয়তিবাদে মিশিয়ে দেওয়ার। কিন্তু যখন তারা কোনও আইআইটি, কোনও ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি বা আইআইএম-এর মতো প্রথম সারির ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোই আসলে দেশের মেধাভিত্তিক উত্তরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ব্যবস্থার প্রতিটা নিয়ম মেনে চলার পুরস্কারের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তখন সেই নিয়তিবাদ আর কাজ করে না। এরা সমাজের সেই অংশ, যাদের জন্যই বিজেপির উত্থান সম্ভব হয়েছিল, আর এরাই এখন আবিষ্কার করছে যে সেই উত্থানের এমন পরিণতি হচ্ছে।
এই ছাত্রছাত্রীদের অনেকের কাছে, চিকিৎসাবিদ্যাই ছিল শেষ দরজা, যেখানে এখনও পারিবারিক যোগাযোগের চেয়ে মেধার ভিত্তিতে ঢোকা যায় বলে মনে হত; তাই একটা প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়া পরীক্ষাকে ঘিরে এত তীব্রতা, যা হয়তো একটা ছোটখাটো প্রশাসনিক কেলেঙ্কারি বলেই চালিয়ে দেওয়া যেত। নিট কেলেঙ্কারি এই সংকট তৈরি করেনি। এই সংকট এমন একটা প্রজন্মের, যারা আগে থেকেই একটা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে, যাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। এই কেলেঙ্কারি তাদের কাছ থেকে সেই শেষ আলোটাও কেড়ে নিল, যেদিকে হাঁটা যায় বলে তারা ভাবত। এরপর যা ঘটেছে তাকে বলা হয়েছে একটা সামাজিক আন্দোলন। ভুল নয়। একটা প্রজন্মগত বিদ্রোহ, একটা ডিজিটাল অভ্যুত্থান। কিন্তু এটা আরও নির্দিষ্ট কিছুও বটে - স্বচ্ছল, যোগ্যতাসম্পন্ন, শহুরে মধ্যবিত্তের অংশের ভেতরে এটা একটা দৃশ্যমান শ্রেণিদ্বন্দ্বের তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠা। ভারতীয় রাজনীতি তিরিশ বছর ধরে নতুন করে র্যাডিক্যাল হওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা নেই বলে ধরে নিয়েছিল। সেই ধারণা আর টিকছে না।
আন্দোলন এখনও যা করতে পারেনি
ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত শক্তিই ছিল তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, এর কোনও কেন্দ্র ছিল না। গ্রেফতার করার মতো কোনও পলিটব্যুরো ছিল না, হানা দেওয়ার মতো কোনও সদর দফতর ছিল না, নীরব থাকলেই যার নীরবতায় আন্দোলন থেমে যেত, এমন কোনও একক নেতা ছিল না। জন্তর মন্তরের মঞ্চ যখন ভেঙে দেওয়া হল আর সংসদের দিকে মিছিলের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হল, তখন আন্দোলনের কাছে ফিরে যাওয়ার মতো কোনও কেন্দ্রীয় কাঠামো ছিল না, ছিল হাজার হাজার ছোট ছোট, তাৎক্ষণিক, একে অপরের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়াস, কেউ এখানে ভিড় সামলাচ্ছেন, কেউ ওখানে আহতদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, গোটাটার দায়িত্বে কেউ ছিলেন না। ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্রের চিরাচরিত কৌশল একের পর এক ব্যর্থ হল। বৈধতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা কাজ করল না, কারণ বিদেশি অর্থসাহায্যের অভিযোগ তোলার মতো কোনও সংগঠনই ছিল না। যে যন্ত্র এক দশক ধরে ভারতীয় বিরোধী রাজনীতিকদের এমন মামলায় জর্জরিত করে এসেছে যা কমই দোষী সাব্যস্ত করে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই ক্লান্ত করে দেয়, সেই এনফোর্সমেন্ট ব্যবস্থার হাতে এমন ঊনিশ-কুড়ি বছরের তরুণ-তরুণীদের ওপর কোনও প্রভাব খাটানোর উপায় ছিল না, যাদের রক্ষা করার মতো কোনও কেরিয়ারই আর অবশিষ্ট নেই। যা বাকি ছিল, তা নিছক শক্তিপ্রয়োগ, লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, আন্দোলনের নিজস্ব হিসেব অনুযায়ী শতাধিক আহত এবং যে আঘাত হজম করে পরদিন অন্য কোথাও আবার সংগঠিত হতে পারত।
কিন্তু এভাবে সংগঠিত একটা আন্দোলনের কাছে নিজের জয়কে সংহত করার মতও কোনও প্রক্রিয়া নেই, আর নিজের সামাজিক অবস্থানের বাইরে কারও সঙ্গে সহজাত কোনও সেতুও নেই। সংসদ মার্গ যাদের ভিড়ে ভরে উঠেছিল, তারা অস্বাভাবিকভাবে শহুরে, যোগ্যতাসম্পন্ন আর এমন পরিবার থেকে আসা যাদের হারানোর মতো কিছু আছেঃ অভিভাবক, পেশাদার, প্রবীণ নাগরিক, একজন গান্ধীর ছদ্মবেশে দাঁড়ানো ছাত্র আর আসল পরীক্ষার্থীরা। এই গঠন কোনও নৈতিক ত্রুটি নয়; এটা একটা সত্য অর্থাৎ এই আন্দোলনের অভিযোগ ঠিক কাদের সরাসরি স্পর্শ করে তার প্রমাণ। এর মানে হল, আন্দোলন যেভাবে গঠিত, তার সঙ্গে দেশের বৃহত্তর শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর, অসংগঠিত শ্রমিক, শিল্প করিডরের ঠিকা শ্রমিক, নির্মাণক্ষেত্রের পরিযায়ী শ্রমিক, যাদের কাছে "কর্মহীন ইকোনমিক গ্রোথ" কোনও নতুন খবর নয়, তাদের সঙ্গে সহজাত কোনও যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন যেখানে সরাসরি জন্ম নিয়েছিল একটা কৃষিজীবী শ্রেণির নিজেদের বস্তুগত অবস্থান রক্ষার লড়াই থেকে, ককরোচ আন্দোলন তার চেয়ে অনেক বেশি ব্রাজিলের ২০১৩ সালের জুন মাসের আন্দোলনের কাছাকাছি যা ছিল নেতৃত্বহীন, ব্যঙ্গাত্মক, অসম্ভব দ্রুতগতির এক বিদ্রোহ, একটামাত্র নির্দিষ্ট দাবির ওপর দাঁড়ানো, বিশৃঙ্খল, কিন্তু সেই দাবি আংশিকভাবে পূরণ হয়ে গেলেই তুলনামূলকভাবে ভঙ্গুর। ব্রাজিলের সেই শক্তিকে কোনও সংগঠিত বাম গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত না থাকায়, শেষমেশ তা ধরা দিয়েছিল দক্ষিণপন্থীদের হাতে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার এই নির্দিষ্ট অভ্যুত্থানকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিতে পারেনি; এতে কোনও ধর্মীয় চিহ্ন নেই, আর এর ভিত্তি শাসক দলের নিজের মূল সমর্থকগোষ্ঠী থেকেই উঠে এসেছে, কিন্তু এই অসুবিধাগুলো চিরকাল বজায় থাকবে না।
লড়াই যেভাবে শেষ হল, তার নিষ্পত্তি ঠিক এই যুক্তি মেনেই হয়েছে যে একজনকে বের করে দাও, কাঠামোটা রেখে দাও। প্রধানমন্ত্রী কখনও সামনে আসেননি। দুই মন্ত্রী আলোচনা করেছেন। একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন আর ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা পরিচালনকারী সংস্থা অক্ষত থেকে গিয়েছে। চারটি শ্রম কোডও অক্ষত থেকে গিয়েছে। একটা স্নাতক প্রজন্ম আসলে কোথায় কাজ পাবে, সেই মূল প্রশ্নটা থেকে গিয়েছে। পদত্যাগের একদিন পরেই, প্রতিবাদক্ষেত্র খালি হয়ে গিয়েছে।
এরপর কী
ছাত্রছাত্রী আর জেনারেশন জ়েড ইতিমধ্যেই সেই একটা কাজ করে ফেলেছে, যেটা সংগঠনহীন একটা আন্দোলন ভালোভাবে করতে পারে - তারা এই অস্বস্তিকে দৃশ্যমান, অনস্বীকার্য আর অন্য কারও সমস্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব করে তুলেছে। এটা কম কিছু নয়। বারো বছরের অটুট শাসনক্ষমতা মাত্র কিছু রসিকতার জেরে একজন মন্ত্রীকে হারিয়েছে। কিন্তু পদত্যাগটা তো ছিল স্বাভাবিক অংশ। এই আট সপ্তাহের আসল ফসল ছিল সেই প্রমাণ যে এই সরকারকেও নড়ানো যায়।
যুবদের এই প্রদর্শন স্মৃতি না হয়ে একটা শক্তিতে পরিণত হবে কিনা, তার উত্তর এই আন্দোলন একা দিতে পারবে না, কারণ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এটা তৈরিই হয়নি। সেই কাজ তাদের, যারা সত্যিই একটা শ্রেণিচ্যুত, যোগ্যতাসম্পন্ন যুবসমাজকে সেই শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত করার ব্যাপারে গুরুত্বসহকারে ভাবছে যাদের নিরাপত্তাহীনতা আরও প্রাচীন, আরও গভীর, আর অনেক কম দৃশ্যমান - অসংগঠিত শ্রমিক, ঠিকা শ্রমিক, হরিয়ানা আর উত্তরপ্রদেশের শিল্প করিডরের পরিযায়ী শ্রমিক, যাদের কাছে কর্মহীন বিকাশ কোনওদিন কোনও নতুন আবিষ্কার ছিল না, বরং তা হল সারাজীবনের একটা বাস্তবতা। এই দুইয়ের মধ্যেকার সেতুটা নিজে থেকে তৈরি হয় না - ভারতের বাম এই কাজটা সচেতনভাবে করবে কিনা আর এই ক্ষোভের স্পন্দনটা আবার স্ক্রলের মধ্যে হারিয়ে যাবে কিনা তার ওপরেই সবকিছু নির্ভর করবে।
মতামত ব্যক্তিগত
ইংরেজিতে প্রবন্ধের লিঙ্ক: https://altviewpoint.in/the-cockroaches-a-new-insecure-class-in-struggle/
ভাবানুবাদ: লেখক
Updated: 3rd August 2026; 6:30 pm

Comments
Post a Comment