বিধানসভায় অধ্যাপক বদলি বিল পাশ: শিক্ষার সংকটের সমাধান নাকি স্বায়ত্তশাসনের সংকোচন?
অনন্যা দেব
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অশিক্ষক কর্মীদের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করার বিল পাশ হয়েছে। সরকারের যুক্তি হল নতুন ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক পাঠিয়ে মানবসম্পদের ভারসাম্য ও শিক্ষার মান উন্নত করা হবে। ‘উন্নতি’ জাতীয় সুন্দর ভাষার সহিত নীতি প্রণয়ন করলেই কি তা মহৎ হয়ে ওঠে? এর মাধ্যমে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ার একটি নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে না? Jadavpur University Teachers’ Association (JUTA)-র বক্তব্য, এই ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তার উপর সরাসরি আঘাত; এমনকি রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ অধ্যাপক বা সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে এই ক্ষমতা ব্যবহার করা হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এই আশঙ্কাকে একেবারে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত কয়েক সপ্তাহে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বর্তমান সরকারের আচরণই এই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে। যাদবপুরে ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়। ABVP-র মিছিল, বিজেপির কর্মীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা এবং ABVP-র গুন্ডাদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতীক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিজেপি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যাদবপুরের বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনগুলিকে আক্রমণ করেছেন এবং বলেছেন যে এই নতুন আইনের সাহায্যে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে; যারা যাদবপুরের ঘটনায় সরকারের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের ‘নতুন’ ও ‘দুর্বল’ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার মত ক্ষমতা এই আইনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানেই বিলটির তাৎপর্য আর অস্পষ্ট থাকে না।
এই বিলের বিরোধিতা কোনও ‘বদলি-বিরোধী’ সংকীর্ণ অবস্থান নয়। সরকার কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান চায়, নাকি সমস্যাগুলিকে প্রশাসনিকভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করার ক্ষমতা চায়? কলেজ স্তরে PSC-র মাধ্যমে নিযুক্ত অধ্যাপকদের নির্দিষ্ট সময় পর পর এক সরকারী কলেজ থেকে অন্য সরকারী কলেজে বদলি হওয়ার চল দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। CSC-র মাধ্যমে নিযুক্ত অধ্যাপকদেরও এই আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে না কেন? বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে নিযুক্ত অধ্যাপকরা গবেষণায় যুক্ত থাকেন; বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগগুলোর ক্ষেত্রে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার খাটুনি ও খরচ দুই-ই থাকে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্পেশালাইজেশানের অধ্যাপকদের নিয়োগ করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে অধ্যাপক বদলি একদিকে যেমন তার স্বায়ত্তশাসনের উপর আঘাত, অন্যদিকে তা গবেষণার কাজেও খাঁড়ার ঘা। নিয়োগ দুর্নীতির দায়ে জেলে যাওয়া প্রাক্তন তৃণমূলী শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছিল, 'আমরা মাইনে দিচ্ছি, নাক গলাবো না কেন'? ক্ষমতার অলিন্দে পতাকা বদলেছে কিন্তু কথার সুর একই রয়ে গেছে। এটা স্পষ্ট যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন নয়, এই বদলির আসল উদ্দেশ্য হল মতাদর্শগতভাবে বিরোধী শিক্ষকদের সাজা দেওয়া কারণ ছাত্র আন্দোলন শিক্ষক মহলের প্রশ্রয় দ্বারা পুষ্টি লাভ করে।
শিক্ষকদের উপর এই প্রশাসনিক আক্রমণের সূত্রপাত সাম্প্রতিক যাদবপুরের ঘটনায়। উল্লেখ্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সময় ধরে দেশের এগিয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নিজের জায়গা করে রেখেছে। নতুন করে তার 'সেন্টার অফ এক্সিলেন্স' হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেন্দ্রীয় সরকারী ফান্ডের যা থেকে বিজেপি সরকার বিরত থাকায় নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও পরিকাঠামো উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। যে মিটিং সকল ছাত্রছাত্রীরা মিলে করছিল, যার বিরুদ্ধে ABVP-র এত গাত্রদাহ, সেখানে থমকে থাকা ক্যাম্পাসিং পুনরায় চালু করার আলোচনা হচ্ছিল। তাহলে কি ABVP ক্যাম্পাসিং-এরও বিরুদ্ধে? বিরাজনীতিকরণের ধুয়ো তুলে TMCP শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমস্তরকম প্রতিবাদ স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ABVP সেই পথেই হাঁটছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী যাদবপুরের ঘটনায় সফিস্টিকেটেড অ্যাপিল করে নাম কামিয়েছেন কিন্তু সংবাদমাধ্যম তাকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে গেছেন।
শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রকৃতই শক্তিশালী করতে হলে চাই নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ, উন্নত পরিকাঠামো ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান অর্থ বরাদ্দ এবং শিক্ষান্তে কাজের সুযোগ। তা নিয়ে কটা বিল পাশ হল এই কয় মাসে? আর এটা ঠিক যে প্রগতিশীল আন্দোলন একটু বেশীই শহরমুখী। মুখ্যমন্ত্রী ঝোলা হাতে বেরিয়ে পড়ার যে নিদান দিয়েছেন তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। প্রত্যন্ত জায়গায় ভালো শিক্ষকরা বদলি হয়ে গেলে তাঁদেরও কিছুটা অভিজাত যাপনে পরিবর্তন আসবে এবং পিছিয়ে পড়া এলাকার ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসরুম শিক্ষা ও মেরুদন্ড সোজা রাখার পাঠ তাঁরা দিতে পারবেন। এর ফলে সারা রাজ্যজুড়ে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও ফ্যাসীবাদ বিরোধী লড়াই আরও প্রশ্রয় পাবে।
ন হন্যতে বিবেকাত্মা, ন শাম্যতি চ চেতনা।
পুনরুত্থাস্যতি সত্যম্, তমসোপি পরাজয়ে।।
Picture Courtesy: https://x.com/chhuti_is

গুরুত্বপূর্ণ ভালো লেখা।
ReplyDelete