অর্ধেক আকাশ: ন্যায় ও ক্ষমতার রাজনীতি

অনন্যা দেব 

আর.জি. করের ঘটনা হোক বা বারুইপুরের নাবালিকার হত্যাকাণ্ড - দুটি ঘটনাই আমাদের সমাজের সামনে একই প্রশ্ন তুলে ধরে; নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার কি সত্যিই রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, নাকি তা কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার? আর.জি. কর আন্দোলনের সময় পূর্বতন রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ; চলেছিল প্রমাণ লোপাটের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি অসংবেদনশীল আচরণ। সেই সময় সার্বিকভাবে নারী নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি এক বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নেয়। পরবর্তীতে অবশ্য স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবীগুলো সংযতভাবেই উঠে আসে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেটাই আন্দোলনের প্রধান অভিমুখ হয়ে গিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোকে পিছনের সারিতে ঠেলে দেয়। বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এনকাউন্টারে এক অভিযুক্তের মৃত্যু এবং আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি হয়রানির ঘটনা ইঙ্গিত করছে যে নতুন শাসকের দৃষ্টিভঙ্গি একই তিমিরে রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা গেল অন্য আরেক বাস্তবতা। এখানে অপরাধের নৃশংসতা এবং ভুক্তভোগীর সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বল অবস্থার পরিবর্তে, মূলধারার মিডিয়ার ন্যাক্কারজনক ভূমিকায়, জনগণের অনেকাংশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল নাবালিকা মেয়েটির ধর্মীয় পরিচয়। অর্থাৎ অতিদক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তি এবং কিছু সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে নারী-নির্যাতনের প্রশ্ন থেকে সরিয়ে ধর্মীয় সংঘাতের পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। এর ফলে একটি শিশুর প্রতি সংঘঠিত কুৎসিত অপরাধ এবং তার বিচারের প্রশ্নকে ক্রমশ আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলল। এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক কারণ যখন অপরাধের বিচার ধর্ম, জাত, দল বা ভোটের অঙ্কের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারন মানুষের আস্থা এবং নারী-অধিকারের সংগ্রাম। প্রসঙ্গত, আর.জি. করের ঘটনায় মেয়েটির মা-বাবা নিজেরাও, মেয়ের উপর ঘটা নৃশংস অন্যায়ের ন্যায়বিচার চেয়ে চলমান আন্দোলনে সক্রিয় আন্দোলনকারী হয়ে থেকেছেন পুরো সময় জুড়ে। পরবর্তীতে পানিহাটি বিধানসভায় অভয়ার মা, বিজেপি পদপ্রার্থী হয়ে ভোটে লড়ে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়ে বিধায়িকা হয়েছেন। বারুইপুরের ঘটনায় বিধায়িকা শ্রীমতি রত্না দেবনাথ, যে তির্যক ও কদর্য মন্তব্য রেখেছেন মিডিয়া মারফৎ, তা চূড়ান্ত অসংবেদনশীল এবং ভিক্টিম ব্লেমিং ছাড়া আর কিছুই নয়।  বিরোধী অবস্থানে থাকলে নারী-নির্যাতনের ঘটনা গণআন্দোলনের আহ্বান হয়ে ওঠে কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে একই প্রশ্ন প্রায়শই রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাবের মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ে। ফলে নারী আর নাগরিক হিসেবে উপস্থিত থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক প্রতীকে রূপান্তরিত এক শরীর। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ সবসময় চেয়েছে ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা। কিন্তু তা যখনই বাম রাজনৈতিক শক্তির সহায়তায় সামাজিক পরিবর্তনের কোনো পর্যায় ছুঁয়ে ফেলতে চেয়েছে, তখনই তথাকথিত নন-পার্টিজান আন্দোলনের ধারা লড়াইয়ের ধারকে ভোঁতা করে দিয়েছে। আর অতিদক্ষিণপন্থী শক্তি সাময়িকভাবে দক্ষিণপন্থী তৃণমূলকে ঘুরপথে ব্যাকআপ দিয়ে পরবর্তীতে জনরোষকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে শাসকের মানসিকতা একই - নিজেদের দলের লোকজন অভিযুক্ত হলে তাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা, প্রতিবাদীদের হয়রানি এবং ধর্মীয় সুড়সুড়ির সুযোগ থাকলে তো সোনায় সোহাগা। তাই পেশাভিত্তিক, রাজনৈতিক ব্যানারবিহীন লড়াইয়ের পরিবর্তে জোরদার করতে হবে পার্টিজান লড়াই।  কেবল আন্দোলন চালালেই হবে না, জয়ী হতে হবে। তবেই ফিরবে রাস্তার লড়াইয়ের উপর জনগণের আস্থা।  

Comments

Popular posts from this blog

প্রসঙ্গ চিন

Polemics on 'Fractured Freedom': C Sekhar responds to Kobad Ghandy's views

‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’! - বাম রাজনীতির পর্যবেক্ষণ